খুবই
ভালো মনের চা বিক্রেতা এক চাচা সারা দিন চা বিক্রি করার পর রাতে অবশিষ্ট
চা পৌরসভার ড্রেনে ফেলে দিতেন ৷ ঊনাকে বলেছিলাম, চা টা না ফেলে সকালে গরম
করে বিক্রি করলেইতো পারেন ৷
তিনি বললেন, বাসি চাতে কালার থাকে না ৷ গরম
করলে কালো হয়ে যাবে, সকালে ভালো চা না পেলে দোকানের বদনাম হবে কাস্টমার কমে
যাবে ৷ বললাম, তাহলে ঝুট দোকানে যারা নাইট ডিউটি করে তাদের দিলে ওদের রূহ
দোয়া করবে, আপনারও সওয়াব হবে ৷ জবাবে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, এদেরকে যদি
এখন মাগনা চা দেই কাল থেকে এরা কেউ আর আমার দোকানে চা খেতে আসবে না ৷ উল্টো
মনে মনে দোয়া করবে যেন দিনে আমার চা বিক্রি কম হয়, যাতে রাতে মাগনা খেতে
পারে ৷ লোকটাকে তখন ভীষণ স্বার্থপর মনে হয়েছিলো ৷
ইন্ডিয়ান হজ কমিটির পক্ষ থেকে হাজীদের খাবার পরিবেশনের পার্ট টাইম জব
পেয়েছিলাম ৷ দেড়শ হাজীর খাবার আসলে অনায়াসে দুইশ জনের মাঝে বন্টন করা যায় ৷
এক বেলার খাবার অন্য বেলায় দেওয়ার নিয়ম নেই ৷ অতিরিক্ত খাবার ফেলে না দিয়ে
হোটেলে কর্মরত দেশী ভাইদের দিতে লাগলাম ৷ শেষের দিন হাজীরা চলে যাবে বিধায়
খাবার একটু কম এসেছিল ৷
ভাইদের বললাম, ভাই, আজকে খাবার কম এসেছে ৷ আপনারা
হয় অপেক্ষা করেন, না হয় অন্য ব্যবস্থা করেন ৷ এরপরই প্রতিবাদী কন্ঠস্বর,
আগে না করলেন না কেন? আপনার হাজীগো লাইগা আমরা বইসা থাকুম? আপনার লাগি কি
আমরা পকেটে পয়সা নিয়া বইসা আছি? কাইল কইলেইতো খানা নিয়া আইতাম, ইত্যাদি
ইত্যাদি ৷
দূর সম্পর্কের এক ভাইয়ের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় বিয়েতে সমস্যা হচ্ছিল
বিধায় আব্বা তাকে কিছু জায়গা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন ৷ যে সময় অনুমতি
দিয়েছিলেন সে সময়ে ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না ৷ সামর্থ্য হওয়ার পর
তাকে তিনটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম জায়গাটা ক্রয় করতে, না হয় এর বদলে অন্য
জায়গা দিতে অথবা ছেড়ে দিতে ৷ তিনি কোনটাতেই রাজি হলেন না ৷
পরিচিত এক সেলুনে চুল কাটানোর পর একশত টাকার একটা নোট দেওয়ার পরেও ভাইটি
মুখ বেজার করে রাখতো ৷ অপরিচিত সেলুনে একশ টাকার নোট দেওয়ার পরে ষাট টাকা
ফিরিয়ে দিয়েছিল ৷ দশ টাকা বখশিষ দেওয়ার পর তার মুখে খুশির বন্যা বয়ে
গিয়েছিল ৷ পরিচিত সেই সেলুন দোকানদার এখন দেখলে বলে, ভাই দেখি আগের মতো নাই
৷
নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ দেওয়ার পরেও পরিচিত অটোওয়ালা ভাইদের মুখ কালো
হয়ে থাকে ৷ অপরিচিত অটোওয়ালাদের নির্ধারিত ভাড়া থেকে পাঁচ-দশ টাকা বেশি
দিলে খুশিতে চোখমুখ ঝলমল করে উঠে ৷
কেন এমনটা হয়?
অতিরিক্ত পেতে পেতে মানুষ তার ন্যায্য সীমা ভুলে যায় ৷ মনে করে অতিরিক্ত
পাওনাটা তার অধিকার ৷ যখনই এই অধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন মানুষ ভাবে
লোকটা কত স্বার্থপর ৷ একবারও নিজের সীমার হিসাব কষে না ৷
এক সময় যেসব ভালো
মানুষকে বদলে যেতে দেখে মনে মনে স্বার্থপর ভাবতাম, তাদের কাছে
ক্ষমাপ্রার্থী৷
কেউ জন্মগতভাবে স্বার্থপর, কেউ অতিরিক্ত পেয়ে স্বার্থপর হয়ে যায়, আবার কেউ
নিজের ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে গিয়ে স্বার্থপর হয় ৷
জন্মগত স্বার্থপরদের
কখনো বদলানো যায় না ৷
মায়ার বশবর্তী হয়ে আমরা যাদের প্রাপ্য সীমার অতিরিক্ত
পূরণ করে স্বার্থপর হিসেবে গড়ে তুলি, তাদের সংশোধন করার দায়িত্ব আমাদেরই ৷
না হয় একদিন তারা আমাদেরই স্বার্থপর হিসেবে চিহ্নিত করবে ৷