নিজেকে আল্লাহর একান্ত মুখলিস, অনুগত বান্দা হিশেবে প্রতিষ্ঠা করুন। নিজের আমলকে বাড়িয়ে দিন। পাপগুলো থেকে বেরিয়ে এসে ইবাদাত-আমলে নিজেকে এমন স্থানে উন্নীত করুন যেখানে পৌঁছাতে পারলে আপনার অনুপস্থিতিতে আল্লাহ আপনার সন্তান, আপনার পরিবার-পরিজনদের দেখভালের জন্য একজন খিযিরকে পাঠিয়ে দেবেন।

মৃত্যুর কথা চিন্তা করলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি।
 নিজেদের পাপের কথা ভেবে, যে অনিশ্চিত গন্তব্যে পাড়ি জমাতে হবে, কেমন হবে সেখানকার জীবন— সেসব ভেবে।
 
তবে, আরো একটা ব্যাপারেও দুশ্চিন্তা গ্রাস করে আমাদের, আর তা হলো— আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারের কী হবে? আমার অনুপস্থিতিতে কে হাল ধরবে আমার সাজানো-গোছানো সংসারের?
যদিও চিন্তাটা অমূলক, তাকদির-বিরোধি এবং তাওয়াক্কুল-পরিপন্থী, তথাপি অধিকাংশ মানুষ মৃত্যুর কথা ভাবতে গেলেই শয়তান এই চিন্তাটাকে তার সামনে এনে হাজির করে।
 
যদি আগামিকাল আপনি মারা যান, আপনার ছোট্ট বাচ্চাটার কী হবে তাহলে? তার দেখভাল কে করবে? কে তাকে আগলে রাখবে পরম মমতায়?
যদি আপনি মারা যান, আপনার বিধবা স্ত্রী কিভাবে কাটাবে বাকিটা জীবন? আপনার বৃদ্ধা মা আর বিছানায় পড়ে থাকা অসুস্থ পিতা— কী হবে তাদের সকলের?
সাধারণত এমন চিন্তায় আমরা ঘাবড়ে যাই। ভবিষ্যতের এক ঘোর অনিশ্চয়তার আঁধার ঝেঁকে বসে আমাদের মনে।
 
 
তবে, এই ধরণের ভাবনা থেকে বাঁচতে কুরআন আমাদের একটা সুন্দর সমাধান বাতলে দিতে পারে।
সমাধানটার জন্য আমরা চলে যেতে পারি সূরা আল কাহাফের মূসা আলাইহিস সালাম এবং খিযির আলাইহিস সালামের ঘটনায়। 
 
আমরা জানি— খিযির আলাইহিস সালামের একের পর এক অদ্ভুত কান্ড দেখে মুসা আলাইহিস সালাম আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়ছিলেন। খিযির আলাইহিস সালাম এমনসব কাজ করছিলেন যার আপাতদৃষ্টিতে কোন যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই। দরিদ্র মাঝির নৌকা ফুঁটো করে দেওয়া, একটা বালককে হত্যা করা আর একটা জনপদ থেকে তিরস্কিত হয়েও সেখানকার প্রায় ভেঙে যাওয়া দেয়াল মেরামত করে দেওয়ার মতো কাজ করে তিনি চমকে দিচ্ছিলেন মুসা আলাইহিস সালামকে।
 
এদিকে, সবকিছু ধৈর্য সহকারে পর্যবেক্ষণ করা এবং বিনা বাক্য-ব্যয়ে দেখে যাওয়ার শর্তে খিযির আলাইহিস সালামের সফর-সাথী হওয়ার পরেও বারংবার ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছিলেন মুসা আলাইহিস সালাম। তিনি প্রতিটি ঘটনায় হতবাক হচ্ছিলেন আর প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন খিযির আলাইহিস সালামকে।
ওই সফরে যে তিনটি অবাক কান্ড খিযির আলাইহিস সালামের হাতে সংঘটিত হয়েছিলো তার মধ্যে একটি ছিলো— একটা জনপদে খাবার চেয়ে তিরস্কিত হওয়ার পরেও, ওই জনপদের-ই একটা প্রায় ভেঙে যাওয়া, ভগ্ন দেয়ালকে তিনি নিজের হাতে মেরামত করে দিয়েছিলেন।
 
খিযির আলাইহিস সালামের এই কান্ড দেখে অবাক হলেন মুসা আলাইহিস সালাম। তিনি ভাবলেন, 'আরে, এই লোকগুলোর কাছে আমরা একটু খাবার চাইলাম তা তো দিলো-ই না, উপরন্তু তিরস্কার করে আমাদের তাড়িয়ে দিলো। কিন্তু এই লোক কী-না সেই অকৃতজ্ঞ মানুষগুলো উপকারে লেগে গেলো! উপকার করুক, অন্তত তার পারিশ্রমিক তো নিতে পারে যা দিয়ে আমরা খাবার কিনে খেতে পারতাম'।
খিযির আলাইহিস সালামকে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রশ্ন করে বসেন যে— কেনো এই অকৃতজ্ঞ লোকগুলোর ভগ্ন দেয়াল তিনি মেরামত করে দিলেন বিনা পারিশ্রমিকে? এই প্রশ্নের উত্তরে খিযির আলাইহিস সালাম বলেছিলেন,
'আর ঐ দেয়ালটির বিষয় হলো— তা ছিল ঐ জনপদের দু’জন ইয়াতীম বালকের। তার নীচে তাদের জন্য কিছু সম্পদ রক্ষিত ছিলো। তাদের পিতা ছিলেন একজন সৎকর্মশীল ব্যক্তি। তাই আপনার প্রতিপালক চাইলেন— বালকদ্বয় যৌবনে উপনীত হোক আর তাদের গচ্ছিত সম্পদ বের করে নিক। এটা তাদের ওপর আপনার প্রতিপালকের রহমত বিশেষ'- আল কাহাফ ৮২
 
বাচ্চা দুটো ছিলো ইয়াতীম। তাদের পিতা মারা যাওয়ার আগে তাদের জন্য কিছু সম্পদ গোপনে ওই দেয়ালের নিচে পুঁতে রেখে যান। কিন্তু, এই দেয়াল যদি সত্যি সত্যি ভেঙেই পড়ে, তাহলে তার নিচে থাকা সম্পদগুলো সকলের সম্মুখে চলে আসবে এবং তা বালকদের দেওয়ার বিপরীতে, অন্যেরা ভাগ-বাটোয়ারা করে সাবাড় করে ফেলবে। ফলে, বালকেরা যথেষ্ট বড় না হওয়া অবধি আল্লাহ সেই সম্পদকে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া থেকে আটকে দিলেন।
 
আচ্ছা, খেয়াল করে দেখুন তো, বাচ্চা দুটোর ওপর আল্লাহর এই যে বিশেষ রহমত, তারা না চাইতেও তাদের সম্পদের এই যে রক্ষণাবেক্ষণ— আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া'তায়ালা এটা কেনো করলেন?
উত্তরটা উপরিউক্ত আয়াতের মধ্যেই আছে। ওই আয়াতের একটা জায়গায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা বলেছেন,
'তাদের পিতা ছিলো একজন সৎকর্মশীল ব্যক্তি'।
 
বালকদ্বয়ের প্রতি আল্লাহর এই বিশেষ অনুগ্রহ তাদের কর্মের কারণে আসেনি, বরং তাদের বাবার কর্মের কারণেই এসেছে। বাচ্চা দুটোর সম্পদকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া'তায়ালা রক্ষা করেছিলেন এই জন্যে যে— তাদের বাবা ছিলেন একজন নেককার ব্যক্তি। একজন সালেহ বান্দা। তিনি ছিলেন আল্লাহর একনিষ্ঠ ইবাদাতকারী। ফলে, তিনি মারা যাওয়ার পরেও তার বাচ্চাদের ভবিষ্যত রক্ষার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া'তায়ালা খিযির আলাইহিস সালামের মতো একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিকে নিয়োগ করে দিলেন।
যদি আজ আপনার মৃত্যু হয়, আগামীকাল থেকে আপনার পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ কে করবে সে ভয়ে কি আপনি ভীত?
আপনার মৃত্যুর পরে আপনার পরিবারের কী হাল হবে— তা কি আপনাকে শঙ্কিত করে?
আপনার মৃত্যু হলে আপনার বৃদ্ধা মা'কে দেখে রাখবে কে, আপনার অসুস্থ বাবার প্রয়োজন কে মেটাবে— সেই চিন্তায় কি আপনি কাতর?
 
মৃত্যু হলে, আপনার জমানো সম্পদ সন্তানদের কাজে আসবে কী-না, তা-ও কি আপনাকে চিন্তিত করে?
আপনার মৃত্যুর পর, সন্তানদের ওপর যদি কোন বিপদ আসে, তা কে সামলাবে, পরিবারে কোন বিপদ হলে তা কে দেখবে তা নিয়েও কি আপনি পেরেশান?
 
যদি উপরের সবগুলো প্রশ্নের উত্তর 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে সেই ইয়াতীম বালকদের ঘটনাটাকে পুনরায় স্মরণ করুন যেখানে তাদের জন্য রেখে যাওয়া সম্পদকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া'তায়ালা নিরাপত্তা দান করেছিলেন, রক্ষা করেছিলেন কেবলমাত্র একটা কারণে— তাদের পিতার নেক আমল।
 
যদি চান যে আপনার মৃত্যুর পর আপনার সন্তানাদি, আপনার পরিবার সহ সবকিছুর দায়-দায়িত্ব আল্লাহ নিক, তাহলে নিজেকে আল্লাহর একান্ত মুখলিস, অনুগত বান্দা হিশেবে প্রতিষ্ঠা করুন। নিজের আমলকে বাড়িয়ে দিন। পাপগুলো থেকে বেরিয়ে এসে ইবাদাত-আমলে নিজেকে এমন স্থানে উন্নীত করুন যেখানে পৌঁছাতে পারলে আপনার অনুপস্থিতিতে আল্লাহ আপনার সন্তান, আপনার পরিবার-পরিজনদের দেখভালের জন্য একজন খিযিরকে পাঠিয়ে দেবেন।
 
 
Fb CP 

অপকারী জ্ঞান আর অহংকার থেকে পানাহ চাই।

 

কেউ গায়ক ছিল, তবু নেশা ভুলে, রুটিরুজির পথ বন্ধ করে গান ছেড়ে এলো। মাশাআল্লাহ, আল্লাহ তার জন্য দ্বীনের পথ আবাদ করুন। 
 
অন্যদিকে কেউ কুরআনিক সায়েন্স পড়ে মানুষকে ইসলামের নতুন সংজ্ঞা শেখায়, একই সাথে পাবলিক পোস্ট দিয়ে বলিউডি নাচগানের বিবরণ দেয়, দেশের মাটিতে বলিউডি মুভি বানানোর স্বপ্ন দেখায়! বাহ, ইসলামের কী "উন্নত" সংজ্ঞা শিখছে সবাই তার কাছে, আমি চিন্তা করি। 
 
দ্বীন এত সস্তা না।
 দিনশেষে যে যার পথ বেছে নিবে। সমস্ত জাহেলিয়াতকে সাদরে সম্ভাষণ করা লোকের অনেক খ্যাতি, অনেক অনুসারী থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলেই তার শেখানো বুলি ইসলাম হয়ে যায় না।
 আল্লাহর দ্বীন আল্লাহই হেফাজত করেন, করবেন।
 খড়কুটোর মতো কোনো অচেনা লোকের মাধ্যমে দিয়ে হলেও করবেন। 
যে হয়তো কুরআনিক সায়েন্সে পড়ে নাই, কোনো সাবজেক্টে পি এইচ ডি প্রাপ্ত না, কিন্তু তাকে দেখলে আপনি বুঝবেন সে নবীজির ﷺ সুন্নত বুকে ধারণ করেছে। নবীজির ﷺ দ্বীন হলো সেই দ্বীন যা দেখে জাহেলিয়াত ভয়ে কেঁপে উঠেছিল, সেই দ্বীন যে দ্বীন পালনের দৃঢ়তা দেখে শত্রুও তার শত্রুতা ভুলে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
 
 আর আমরা আছি, জাহেল দুনিয়ার সমস্ত কিছুর সাথে তাল মিলিয়ে সেটাকেই দ্বীন মনে করি, সেটাকেই দ্বীন বলে শেখাতে চাই।
 আমাদের নিজেদেরই দ্বীন পালনের কোনো দৃঢ়তা নাই। 
খুব পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতার কথা বলে উল্টাই, কিন্তু এইটুকুও বুঝি নাই যে হিজাব কীভাবে করতে হবে, বলিউডি নাচগান দেখা কেন জায়েজ না এইটুকু মাথায় ঢুকে নাই,
 এই সহজ ব্যাপারটা বুঝি নাই যে ফেমিনিজমের তালে তালে নারী-পুরুষ সমঅধিকারের বুলিতে বিশ্বাস আনা দ্বীনের কথা না।
 অথচ যার দ্বীন নিয়ে এত জ্ঞান নাই, যে ইসলাম পালন করতে চায় মাত্র দুইদিন হইসে, সে-ও বোঝে এইগুলা দ্বীন না। কারণ সে নিজের সাথে সৎ, আল্লাহর সাথে সৎ। 
 
কোনো কোনো সময় জ্ঞানও মানুষের জন্য ফিতনা হয়ে যায়। 
পশ্চিমাদের শেখানো ইসলাম নিয়ে অহংকার করতে গিয়ে পুরোনোদিনের আলেমদের বোকা মনে হয়। আসলে অহংকার মানুষকে পথভ্রষ্ট করে ফেলে। 
ইবলিসও অহংকারের কারণেই পথভ্রষ্ট হইসিল। এমন অপকারী জ্ঞান আর অহংকার থেকে পানাহ চাই। আল্লাহর উপর ঈমান নিয়ে রাসূলের ﷺ পথে মরতে চাই। আমীন।
 
{CP}
 
কয়েকদিন আগে একটা ছোট সিরিজ দেখেছিলাম।নাথিং ইম্পর্ট্যান্ট!অস্থির চিন্তাগুলোকে ডাইভার্ট করার জন্য হালকা কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকা আর কি!
 
আমেরিকার ছোট একটা বাচ্চা ও তার পরিবারকে নিয়ে ঘটনা।বাচ্চাকে নিয়ে ছিলো বলে প্যারেন্টিংও ফোকাসড ছিলো।
তাদের প্যারেন্টিং এর ব্যাপারগুলো আমাকে খুবই নাড়া দিয়েছে! নিজের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে স্ট্রাগল করে চলেছি,তাই হয়ত!
 
আরেকটা ব্যাপার বেশ নাড়া দিয়েছে আমাকে,তা হলো,প্যারেন্টিং এর জন্য ওরা যা করছে,তার শিক্ষা ইসলাম আরো অনেক আগেই আমাদের দিয়েছে! কিন্তু মুসলিম হয়েও আমরা তা ফলো করতে পারছিনা! 
 
তাই ভাবলাম,প্যারেন্টিং নিয়ে যা শিখলাম,তা পয়েন্ট আকারে লিখে রাখি।আল্লাহ যেন আমাকে একজন ভালো প্যারেন্ট হওয়ার তাওফিক দেয়।
 
১.
বাচ্চাকে বাচ্চা নয়, একজন বড়, বুঝদার মানুষের মতো ট্রিট করা।
অর্থাৎ ঘরের একজন বড় মানুষের সাথে আমরা যেমন আচরন করি,যেভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলি,নিজের বাচ্চার সাথেও সেরকম আচরণ করা।
 সে বাচ্চা,কিন্তু সেও একজন পরিপূর্ণ মানুষ! তার অনুভূতি একজন বড় মানুষের চেয়ে কম তো নয়ই বরং আরো নাজুক! সে আমার সন্তান,তাই বলে তার সাথে যেমন খুশি তেমন আচরন করতে পারিনা! আমি তার মালিক না! আল্লাহ তার মালিক! সে জাষ্ট আমার কাছে আল্লাহর আমানত! আমি যেমন আল্লাহর বান্দা,সে ও আল্লাহর বান্দা! 
 
এই একটা পয়েন্টের ভেতরেই আসলে অনেক কিছু চলে আসে! ঘরের একজন বড় মানুষের সাথে, আমরা অকারণ চিৎকার, চেঁচামেচি, নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া(এটা করতেই হবে তোমাকে, এখনই,টাইপ), আরেকজনের উপর করা রাগ ঝাড়া(যেটা আমরা মায়েরা প্রায়ই করি! জামাইর উপর করা রাগ বাচ্চার উপর ঝাড়ি!),বকা দেওয়া বা মার লাগানো এসব কোনোদিনই করতে পারব না! কিন্তু বাচ্চাদের সাথে ঠিকই করি! 
 
২.
বাচ্চার সাথে অনেক, অনেক কথা বলা!
  যেকোনো কিছু নিয়েই তা হতে পারে! যেকোনো টপিকে!
এবং মনোযোগ দিয়ে বাচ্চার কথা শোনা,তা যত ছোট ব্যাপার নিয়েই হোক না কেন!
 আমার কাছে ছোট ব্যাপার,আমার বাচ্চার কাছে হয়ত তা বড় কিছু!
 নিজের আনন্দ বা কষ্ট নিয়েও বাচ্চার সাথে কথা বলা যেতে পারে!তাদের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে!যেমন,আমি আমার বড় ছেলের সাহায্য চাচ্ছিলাম যে,আমি তোমাদের সাথে রাগ করতে চাই না,কিন্তু মা পারছি না!তোমদের কাজে আমার সবর ভেঙে যায় বারবার! প্লিজ আমাকে হেল্প করো! 
 
৩.
পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহনেও বাচ্চাদের রাখা,তাদের মতামত শোনা। 
এতে বাচ্চারা অনুভব করে যে,তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে! সেও পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।এতে সে দায়িত্ব নেওয়া শেখে।
 
৪.
বাচ্চাদের নিজেদের কাজ নিজেদের করতে শেখানো। 
এর পাশাপাশি ঘরের কাজও বয়স অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া।তুমি এই পরিবারের, এই ঘরের একজন সদস্য।তাই ঘরটাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে তোমাকেও অংশগ্রহণ করতে হবে! সবাই মিলেই তো পরিবার! 
 
৫.
বাচ্চাদের গায়ে কক্ষনোই হাত না তোলা।
 বাচ্চাদের কাজে রাগ হলেও যথাসম্ভব ঠান্ডা থাকার চেষ্টা করা।বকা দেওয়ার সময় ভাষার ব্যবহারে সাবধান থাকা।একান্তই না পারলে স্রেফ বাচ্চার সামনে থেকে সরে যাওয়া।এভাবে বলে যে,তোমার কাজে আমার রাগ হচ্ছে।আমি এখন তোমার সামনে থেকে সরে যাচ্ছি।এটা নিয়ে পরে কথা বলব তোমার সাথে।
তারপর মাথা ঠান্ডা হলে বাচ্চার সাথে সে ব্যাপারে কথা বলা।বাচ্চাকেও ভাবতে বলা যে,সে যেই কাজটা করেছে,তা ঠিক হয়েছে কিনা।
 
৬.
বাচ্চাকে "এটা করো"," ওটা করো" না বলে,কেন কাজটা করতে হবে,এটা সহ বুঝিয়ে বললে,সেই কাজ বাচ্চারা মন থেকে করার চেষ্টা করে। 
 
 এটার জন্যেও আসলে বাচ্চাদের সাথে মন খুলে কথা বলার প্রয়োজন।
 
বাচ্চার সাথে সম্পর্কটা এমন রাখার চেষ্টা করতে হবে,যেকোনো পরিস্থিতিতে বাচ্চাকে মানসিক এবং মোরাল সাপোর্ট দিতে হবে যেন যেকোনোকিছুতে বাচ্চা বন্ধুবান্ধব বা এমন কারো কাছে ছুটে না যেয়ে আপনার কাছেই ছুটে আসে!
 
 বাচ্চা অপরাধ করলে একগাদা বকা দিয়ে দিলে সে পরবর্তীতে তার অপরাধ আপনার থেকে লুকাবে।কিন্তু যদি বুঝিয়ে বলেন,কেন তার কাজটা ভুল হয়েছে এবং আপনি কষ্ট পেয়েছেন,তাহলে বরং সে আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য স্যরি ফিল করবে।
 
৭.
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার প্রচলন করা। 
ভুল হলে স্যরি বলতে দ্বিধা না করা।বাচ্চার কাজে খুশি হলে জাযাকাল্লাহু খাইরান / ধন্যবাদ বলা,বাচ্চার প্রশংসা করা,বাচ্চার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা বা সন্তান হিসেবে তাকে পেয়ে আপনি গর্বিত, এটা প্রকাশ করা খুব জরুরি!
বাচ্চাকে একবার বকা দিলে, পাঁচবার আদর করে দিবেন।যেন সে বকাটা ভুলে যায়,ভালোবাসাটা মনে রাখে! 
 
৮.
একসাথে পারিবারিক সময় কাটানো এবং প্রতিটা বাচ্চার সাথে আলাদা করে সময় কাটানো। 
 
এটা খুব এফেক্ট করে বাচ্চাদের সাথে সম্পর্ক মজবুত করতে!
যেমন,একসাথে সবাই মিলে রাতের খাবার খাওয়া আর টুকটাক গল্প করা।
সবার দিন কেমন কাটলো,সেই খোঁজ নেওয়া।সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেড়াতে যাওয়া।অন্তত একটু রিকশায় করে ঘুরে আসা বাচ্চাকে নিয়ে আর পুরোটা সময় বাচ্চার সাথে কথা বলা,তার কথা শোনা।
বাবা একটা বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে গেলে মা আরেকটা বাচ্চার সাথে ঘরে একটা কিছু গেইম খেলল বা দুজন মিলে কিছু বানালো আর গল্প করল!
এভাবে অল্টারনেট করে বাবা, মা দুজনে প্রতিটা বাচ্চার সাথে আলাদা কোয়ালিটি টাইম কাটানো।
 
দুনিয়াটা খুব র‍্যাপিডলি চেঞ্জ হচ্ছে।এখন একটা বাচ্চার লালনপালনে আমরা যেসব অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছি,আমাদের বাবা মা বা আমাদের দাদা দাদীর সময় অবস্থা অন্যরকম ছিলো! এই জেনারেশনকে আল্লাহ এই সময়ের জন্য উপযুক্ত করেই তৈরি করেছেন! তাই প্যারেন্টিং এর বিষয়টাকে ছোট করে দেখলে চলবে না!
বাবা মা দুজনকেই এই কাজে অংশ নিতে হবে! 
আর আল্লাহর কাছে অনেক, অনেক দুয়া করে যেতে হবে প্রতিনিয়ত! সন্তানের জন্য করা বাবা মায়ের দুয়া আল্লাহ কখনোই ফিরিয়ে দেন না।
সেই ছোট ছেলেটার একটা কথা আমার খুব কানে বাজে! ও ওর মা কে বলেছিলো,এই পৃথিবীতে ৭০০মিলিয়ন মানুষ, কিন্তু তুমিই আমার জন্য পারফেক্ট মা! তাই তো স্রষ্টা তোমাকেই আমার মা বানিয়েছেন!
এই জীবনে আমার বাচ্চারা কোনোদিন আমাকে নিয়ে এমন ভাববে কিনা জানিনা! আমার চেষ্টা করে যেতে দোষ কি?! আল্লাহ আমাকে তাওফিক দিক,আল্লাহর এই বান্দাদের যথাযথ তারবিয়ত দেওয়ার।
-তাহমীনা আপু ( আল্লাহ ওনার সন্তানদের সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন এবং তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিন।)

 Post link

।।। সালাম নিয়ে কিছু কালাম ।।। - উস্তায আব্দুল্লাহ আল মাসউদ


ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলাম। সিএনজি থেকে নেমে হাঁটছি। 
বাজার পার হয়ে একটু সামনে বাড়তেই গ্রামের শুভ্রদাড়ির একজন মুরুব্বি সামনে পড়লেন। তাকে সহাস্যমুখে সালাম দিলাম,
- আসসালামুআলাইকুম
- ওয়ালাইকুমুসসালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। 
 
তার উত্তর নিয়ে পরে আবার পাল্টা সালাম দেওয়া দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। উত্তর দিবো কি দিবো না ভাবতে ভাবতেই তিনি আমাকে পেছনে ফেলে সামনে চলে গেলেন। আমি কিছু না বলেই আবার হাঁটা শুরু করলাম। 
 
বাড়িতে এসে হাতমুখ ধুয়ে যোহরের নামাজ আদায় করলাম। তারপর খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিলাম খাটে। এবার একটু বিশ্রাম করা যাক। বিশ্রামের সময়টাতে যতোক্ষণ না ঘুমঘুম ভাব না আসে, ততোক্ষণ সাধারণত কোন লেকচার শুনতে থাকি। ল্যাপটপটা ওপেন করে একটা লেকচার প্লে করলাম। ইয়ারফোন কানে গুঁজে চোখ বন্ধ করে বালিশে মাথা ঠেকালাম।
 
লেকচারার একজন উর্দুভাষী। তিনি ডালাসে এসে কথা শুরু করলেন এভাবে,
- ইস স্টেজ পর মউজুদ মেরে হারদিল আযীয দোস্ত, আওর ইস নিশাস্ত কা নাজেমে জলসা, আওর ইস মেহফিল মে মউজুদ মেরি ওয়ালিদ সাব কা, দীগর বুযুর্গুঁকা, তামাম ভায়ুঁ কা আর বেহনুঁ কা, ম্যায় ইসলামী তরীকে সে ইস্তেকবাল করতাহুঁ- আসসালামুআলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু!
এখানেও সালামের অপপ্রয়োগ হলো। আর শুনতে মন চাইলো না। লেকচারটা অফ করে কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে নিলাম। 
 
এর কয়েকদিন দিন পরের ঘটনা। একজন প্রকাশক তাদের নতুন বই প্রকাশ উপলক্ষে লাইভে এসেছেন। তিনি আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে কথা শুরু করলেন এভাবে-
'দেশেবিদেশে অবস্থান রত অমুক পাবলিকেশন্সের সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, শুভানুধ্যায়ীবৃন্দ, লেখকবৃন্দ এবং আরো যারা আমাদের ভালোবাসেন আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।'
 
সালাম নিয়ে আমাদের সমাজে ঘটে চলা ঘটনাগুলোর সামান্য ক'টি খণ্ড চিত্র এগুলো। এর বাইরেও আরও বহু চিত্র আছে। যেগুলো সালাম নিয়ে আমাদেন জানার কমতি ও বুঝের ঘাটতি থাকার কথাই প্রমাণ করে। 
 
প্রথম ঘটনায় সেই মুরুব্বিকে আমি আগে সালাম দিয়েছিলাম। তিনি উত্তর নিলেন। ব্যাস, হয়ে গেলো। কিন্তু উনি উত্তর নিয়ে পরে আবার পাল্টা যে সালাম দিলেন এটি হলো ভুল প্রথা। সুন্নাহ একে সমর্থন করে না। সুন্নাহ যেটা বলে সেটা হলো, একজন সালাম দিবে অন্যজন তার উত্তর দিবে। ব্যাস, এটুকুই। সালামের উত্তর নেওয়ার পর পুনরায় পাল্টা সালাম দেওয়ার রীতি সুন্নাহসম্মত নয়।
 
 
এমন ঘটনার সম্মুখীন আমি এর আগেও বহুবার হয়েছি। মোবাইলে সালাম দিয়েছি তো ওপাশের মানুষটি সালামের উত্তর নিয়ে পাল্টা নতুন করে আবার আমাকে সালাম দিয়েছে। এমনটা করার কারণ হলো, অনেকেই মনে করে সালাম যেহেতু অন্যকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যম তাই অন্যজন আগে সালাম দিয়ে ফেললেও পুনরায় ঘুরিয়ে তাকে সালামটা জানিয়ে দিতে হবে। নইলে যথাযথ সম্মান জানানো হয় না। অথচ প্রকৃত বিষয়টি তেমন নয়।
 এটি কেবলই আমাদের মনগড়া একটি বিশ্বাস।
আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, মূল সালাম ও তার জবাবের বাক্য হুবহু একই রকম বলা যায়। পার্থক্য শুধু এতোটুকু যে, মূল সালামের বাক্যে আলাইকুম কথাটা পরে থাকে কিন্তু জবাবের মধ্যে তা আগে চলে আসে। দেখুন- আসসালামুআলাইকুম এর উত্তর হলো ওয়ালাইকুমুসসালাম। তো দেখা গেলো, অর্থও উভয়টার একই রকম ধরা যায়। ফলে এমনটা ভাবার কোন যৌক্তিকতা নেই যে, সালামের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা উত্তরের মধ্যে নেই।যার ফলে আপনাকে উত্তর নিয়ে পুনরায় সালাম শুরুর বাক্যটা শুনিয়ে দিতে হবে। 
 
 
এবার আসি দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঘটনাতে। এই বিষয়টার ছড়াছড়ি আমাদের সমাজে এতো বেশি যে, একে মহামারি পর্যায়ের সমস্যা বললেও অত্যুক্তি হবে না। ধর্মীয়
মাহফিল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বক্তৃতার মঞ্চ কোনটাই এর থেকে মুক্ত নয়। বক্তা প্রথমে উপস্থিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন বাক্যে সম্বোধন করে সব শেষে সালাম দেয়। এটা সুস্পষ্টভাবে হাদীসের নির্দেশনার খেলাফ। হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আগে সালাম পরে কালাম।' [১] তাই প্রথমেই সালাম দিয়ে তারপর অন্যান্য কথা বলা উচিত। নইলে শুরুতেই সালাম থাকার সুন্নাহটি আদায় হয় না। 
 
 
সালাম কে কাকে দিবে সেই বিষয়েও হাদীসে নির্দেশনা রয়েছে। এই বিষয়ে কয়েকটি হাদীসের উপর নজর বুলানো যাক। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহুআনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আরোহী পদচারীকে, পদচারী উপবিষ্টকে এবং অল্প সংখ্যক অধিক সংখ্যককে সালাম দিবে। [২]
 
আমি অনেক বছর আগে আলিয়া মাদরাসায় পরীক্ষা দেবার জন্য একবার ভর্তি হয়েছিলাম। যদিও পরে আগ্রহ অনুভব না হওয়ায় বাদ দিয়েছিলাম। তো ভর্তি হবার পরে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ আমি ক্লাস করেছিলাম সেখানে। দেখলাম, শিক্ষক ক্লাসে আসলে ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই দাঁড়িয়ে সমস্বরে তাকে সালাম দেয়। অথচ এটাও সালাম বিষয়ে হাদীসের নির্দেশনার খেলাফ। সুন্নাহ হলো, যিনি আগমন করবেন তিনি উপবিষ্টদের সালাম দিবেন। দেশসেরা অনেক আলেমের ক্লাসে বসার সুযোগ আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। তাদের দেখেছি, ক্লাসে এসে নিজেরাই শুরুতে সালাম দিচ্ছেন। এটাই হলো সালামের ক্ষেত্রে নববী আদর্শ। 
 
 
ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত একটি হাদীস থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, কোন মজলিসে যিনি আগমন করবেন তিনিই সালাম দিবেন। মজলিসের লোকেরা আগমনকারীকে সালাম দিবে না। হাদীসটি হলো, একজন ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে এভাবে সালাম করলো ‘আসসালামু আলাইকুম’ আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জবাব দিলেন। অতঃপর লোকটি বসে গেলে তিনি বললেন, 'তার জন্য দশটি নেকী।' তারপর দ্বিতীয় ব্যক্তি এসে 'আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ' বলে সালাম পেশ করলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের উত্তর দিলেন এবং লোকটি বসলে তিনি বললেন, 'তার জন্য বিশটি নেকী।' তারপর আরেকজন এসে 'আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ' বলে সালাম দিলো। তিনি তার জবাব দিলেন। অতঃপর সে বসলে তিনি বললেন, 'তার জন্য ত্রিশটি নেকী।'[৩]
 
 
সালাম দিলে কেউ ছোট হয়ে যায় না। এমন না যে, শিক্ষক সম্মানীত ব্যক্তি বলে তিনি সালাম দিবেন না। বরং সালাম কেবল নিবেন। অনেক বয়সে বড়ো ব্যক্তিদের মধ্যেও এই ভুল ধারণা দেখেছি।
তারা কখনোই ছোটদের সালাম দেন না। তাদের থেকে সালাম পাওয়ার প্রতীক্ষায় থাকেন। বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের সালাম দেন না। তারা ধরেই নিয়েছেন যে, ছেলে-মেয়েরাই কেবল তাদের সালাম দিবে। যেহেতু তারা বড়ো ও শ্রদ্ধেয়। এমন ধ্যান-ধারণা লালন করার ফলে সবচে বড়ো যে ক্ষতিটা হয় তা হলো আগে আগে সালাম দেওয়ার যে ফযীলত হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে মাহরূম হওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে আগে সালাম দিবে সে অহংকার থেকে মুক্তি পাবে।'[৪] 
 
সুতরাং যারা আগে সালাম দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তারা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। অহংকারের মতো মারাত্মকব্যাধি দূর করার এতো সহজলভ্য প্রতিষেধক থেকে দূরে সরে থাকা যে চরম বোকামি তা তো বলাই বাহুল্য। 
 
ছোটদেরকে সালাম দেওয়ার আমল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবী ও তাবেয়ীদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো। অল্পবয়সী বলে তারা ছোটদের সালাম দিতে কখনো কার্পণ্য করতেন না। এই বিষয়ে হাদীসের কিতাবে চমৎকার একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। সাইয়্যার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি সাবিত আল-বুনানী রাহিমাহুমাল্লাহ-এর সাথে হাঁটছিলাম। তিনি কয়েকজন শিশুর পাশ দিয়ে চলার সময় তাদেরকে সালাম দিলেন এবং বললেন, কোন একদিন আমি আনাস রাদিয়াল্লাহুআনহু-এর সাথে ছিলাম। তিনি শিশুদের পাশ দিয়ে চলার সময় তাদেরকে সালাম দিলেন এবং বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। তিনি শিশুদের পাশ দিয়ে চলার সময় তাদেরকে সালাম দিয়েছেন।[৫]
 
 
অনেকে আবার সালামের ক্ষেত্রে পরিচিত-অপরিচিতর তারতম্য করেন। মানে হলো, পরিচিত কেউ হলে তো সালাম দেন। কিন্তু যদি অপরিচিত কেউ হন তখন আর সালাম দেন না। এর পেছনে অবশ্য অন্য আরেকটা কারণও কাজ করে। তা হলো, পরিচিত কেউ হলে তাকে সালাম না দিলে নিজের কাছেই অনেক সময় লজ্জা লাগে। আবার অনেক সময় পরিচিত সেই লোককে সালাম না দিলে তিনি কী মনে করবেন এমন একটা ভাবনাও কাজ করে। কিন্তু অপরিচিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তো আর সেই আশংকা নাই। তাই তাদেরকে সালাম দেওয়ার গরজ অনুভব হয় না।
আমাদের এই মানসিকতাটাও বর্জনীয়। কারণ একবার সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ হতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলো, 'ইসলামের কোন আমল সুন্দর বা সর্বোত্তম?' জবাবে তিনি বললেন, 'অভাবীদের পানাহার করানো, আর পরিচিত-অপরিচিত সকলকে সালাম দেয়া।'[৬]
 
 
তাছাড়া কেবল পরিচিতদের সালাম দেওয়া আর অপরিচিতদের সালাম না দেওয়াটাকে হাদীসে কিয়ামতের আলামত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেয়ামত যতো নিকটে ঘনিয়ে আসছে এর বাস্তবতা ততো প্রস্ফুটিত হচ্ছে। ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহুআনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সূত্রে বর্ণনা করেন, 'কিয়ামতের একটা আলামত হলো, একজন মানুষ আরেকজন মমানুষকে কেবল পরিচিতির সূত্র ধরেই সালাম দিবে।'[৭]
 
 
পরস্পরে সাক্ষাৎ হলে সালাম দেওয়ার অভ্যাস যাদের আছে তাদের মধ্যেও একটা বিষয়ের কমতি দেখা যায়। তা হলো, ঘরে প্রবেশ করার সময় সালাম না দেওয়া। অথচ এটি ঘরে বরকত আনয়নের একটা মাধ্যম। যেমন, এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'তুমি যখন তোমার পরিবার-পরিজনের নিকটে যাও, তখন সালাম দিও। তাতে তোমার ও তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য তা বরকত হবে।'[৮] 
 
 
তবে সালামের যে বিষয়টি আমার সবচে ভালো লাগে তা হলো, সালামের মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা-সৌহার্দ্য জন্ম নেয়। আপনি নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যার সাথে আপনার মনোমালিন্য রয়েছে সামনাসামনি হলেই তাকে সালাম দিতে ভুলবেন না। দেখবেন কয়েকদিনের মধ্যেই দু'জনের মধ্যে একধরনের প্রীতিবোধ তৈরি হয়ে যাবে। সে হিসেবে সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে সালাম একটি মোক্ষম প্রতিষেধকই বলা যায়। হাদীস থেকেও বিষয়টি প্রমাণীত। 
 
আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহুআনহু থেকে বর্ণিত এক হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে।'[৯]
তবে অনেকের অভিযোগ থাকতে পারে যে, আমি তো নিয়মিত সালাম দেই কিন্তু এসব ফায়দা তো পাই না। আসলে সালামের ফায়দা থেকে বঞ্চিত হবার একটা বড়ো কারণ হচ্ছে বিশুদ্ধভাবে সালাম না দেওয়া। আজকাল মানুষজন দায়সারা গোছের সালাম দিয়ে থাকে। যেন কোন মতে একটা বাক্য উচ্চারণ করে দায় শেষ করাই থাকে উদ্দেশ্য। 
 
 
সালামের ক্ষেত্রে মানুষ বেশি ভুল করে থাকে যেসব জায়গাতে তা হলো, শুরুর হামযাহকে হটিয়ে দিয়ে স্লামালাইকুম
বলা। অথবা সীন ও লামকে এক সাথে মিলিয়ে আস্লামুআলাইকুম বলা। এগুলোর কোনটিই ঠিক নয়। বিশুদ্ধ সালাম হলো, শুরুর হামযাহকে বহাল রেখে সীন ও লামকে আলাদা করে উচ্চারণ করা- আসসালামুআলাইকুম। 
 
সালামকে বিকৃত করা মূলত অভিশপ্ত জাতি ইহুদিদের স্বভাব। হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায়, একবার একদল ইহুদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, 'আস-সামু আলাইকুম!' অর্থাৎ তোমার মরণ হোক। আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহুআনহা উত্তরে বললেন, 'তোমাদের উপরই এবং তোমাদের উপর আল্লাহর লানত ও গযব পড়ুক।'
 
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আয়িশাহ, একটু থামো। নম্রতা অবলম্বন করা তোমাদের কর্তব্য। রূঢ়তা ও অশালীনতা বর্জন করো।' 
 
আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহুআনহা বললেন, 'তারা যা বলেছে তা কি আপনি শোনেন নি?'
তিনি বললেন, 'আমি যা বললাম, তুমি কি তা শোনো নি? কথাটি তাদের উপরই ফিরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং তাদের ব্যাপারে (আল্লাহর কাছে) আমার কথাই কবুল হবে আর আমার সম্পর্কে তাদের কথা কবুল হবে না।'[১০]
 
 
এই কারণে সালাম দেওয়ার সময় সতর্ক থাকা উচিত আমাদের। যাতে করে উচ্চারণ বিকৃতির মাধ্যমে এর অর্থ পরিবর্তন না হয়ে যায়। তাছাড়া এটা যেহেতু ইহুদীদের স্বভাব তাই এর থেকে যতো বেশি দূরে থাকা যায় ততোই মঙ্গল। 
 
সালামের অনেক অনেক ফযীলত আছে। এসব ফযীলতের জযবায় অনেকে আবার জায়গায়-অজায়গাতেও সালাম দিয়ে বসে থাকেন। তার মধ্যে একটা হলো মসজিদের ভেতর উচ্চস্বরে সালাম দেওয়া। মসজিদ হলো ইবাদতের স্থান। এখানে মানুষজন নামাজে-তিলাওয়াতে ও যিকির-আযকারে মগ্ন থাকে। জোরে সালাম দিলে তাদের মনোযোগ নষ্ট হওয়ার সমূহ আশংকা থাকে। তাই মসজিদের অভ্যন্তরে জোরে সালাম দেয়া যাবে না। একান্ত সালাম দিতে চাইলে যারা চুপচাপ বসে আছে তাদের কাছে ক্ষীণ আওয়াজে দেয়ার অবকাশ আছে।[১১]
 
 
আসুন, আমরা বেশি বেশি সালাম প্রদান করি। সালামের প্রচলন ঘটাই। সালাম দিতে যে কার্পণ্য করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শ্রেষ্ঠ কৃপণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।[১২] তাই কৃপণ হওয়া থেকে বাঁচতে চাইলে সালামে অভ্যস্ত হওয়ার বিকল্প নেই।
-------------------------------------
♦ তথ্যসূত্র:
১. তিরমিযী: ২৬৯৯ ; সনদ হাসান।
২. সহীহ বুখারী: ৬২৩২
৩. তিরমিযী ২৬৮৯, আবূ দাউদ ৫১৯৫
৪. শুআবুল ঈমান, বাইহাকী: ৮৪০৭; সনদে কিছুটা দুর্বলতা আছে।
৫. সুনান আত-তিরমিযী: ২৬৯৬; সনদ সহীহ
৬. আবু দাউদ- ৫১৯৬
৭. মুসনাদে আহমাদ: ৩৮৪৮; হাসান
৮. সুনান তিরমিযী: ২৬৯৮; যঈফ
৯. সহিহ মুসলিম: ৯৮
১০. সহীহ বুখারী: ৬০৩০
১১. ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩২৫, ফাতাওয়ায়ে বাজ্জারিয়া :৩/৩০০, আপকে মাসাইল আওর উনকা হল :৮/১৫৭
১২. আলমুজামুল আওসাত, তাবারানী: ৫৫৯১
 
Post link HERE https://www.facebook.com/Umm-Maryams-Diary-1597989236960711/?__cft__[0]=AZWw0l_uGd8dL8funQna1l2alQ8HrAFBygxPBuHorWn2arQMkf0IPVOwOI8edMvsIKsjSoPCcKId8jUs73AmppjyBmgFFTEioFTLYx7UaqA2U6g0W0e9KlUhgHgJfa13pRaiQb1wVVbL2DDcZJaePluwjFbGoDfGIuryifogOenoyXa9kbxm34LUXPKJ2f8vrn4&__tn__=-UC%2CP-R

যুবকদের ভিতরে ঈমান উজ্জীবিত করার কোন দায়িত্ব পিতামাতা পালন করেন না।


চার পাঁচ বছর পর্যন্ত খুউব আদর করেছে।
সাত আট বছরে স্কুলে ছেড়ে দিয়েছে।
বারো তেরো বছরে আর কোন খোঁজই নেয়না।
কি জানে? "আমার ছেলে পড়ে" কে বন্ধু? মসজিদে যায় কিনা? নামাজ পড়ে কিনা? কোন খোঁজ নেয়না।

যখন পনের, ষোল, সতের, আটারো বছর বয়স হয় বাবাও জানে, মাও জানে-'আমার ছেলের অমুক মেয়ের সাথে Affair আছে'। কি যেন বলে? -রিলেশন আছে। শোনেন না এগুলো? মা বাবা জানে না? জানে।

মেয়ের বাবাও জানে, ছেলের বাবাও জানে। মেয়ের মাও জানে, ছেলের মাও জানে যে, 'এই বয়সে তো একটু কিছু হবেই'। এটাই তো কথা! আচ্ছা,এই যে ছেলে মেয়ে রিলেশন করে, এটা ফরয? না ওয়াজিব? না সুন্নাত? নাকি মুস্তাহাব? এটা কি?

- হারাম!

এই হারাম কাজ যদি কেউ মেনে নেয়,আউলাদ হারাম করে,আর বলে 'NO PROBLEM, IT’S OK। বড় হলে সেরে যাবে, তার কি ঈমান থাকে?

শরীয়তের পরিভাষায় তাকে বলা হয় 'দাইয়ূস'। এই হলো পিতামাতার অবস্থা।

কিন্তু প্রব্লেম অন্য জায়গায়, ঐ যে যুবক যুবতী, ওদের ভিতরে ঈমান আছে। ওর মা শেখায়নি, বাবা শেখায়নি, বোন শেখায়নি, ভাই শেখায়নি, স্কুলে ঈমান শেখানো হয়না, প্রতিষ্ঠানে নেই, সমাজে নেই, টিভিতে নেই..

তারপরেও -ফিতরাতি, ন্যাচারাল ঈমান ওর(সন্তান)ভিতরে নড়ে। তাইতো, এই যে ছেলে মেয়ের রিলেশন অবৈধ হলে গুনাহ হবে, কিন্তু মন টানে, সম্পর্ক হয়ে গেছে, একে অপরের কাছে আসতে চায়। আবার পাপের ভয়েও বলে:হুজুর? মোবাইলে প্রেম করলে গুনাহ হবে? -হ্যা বাবা,গুনাহ হবে।

:কি করবো? ওরা তখন ঈমানের তাড়নায় কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে। এতকাল হারাম করছিলো, বাবা মা'র কোন আপত্তি ছিলোনা।

বিয়ে করার পরও কি হারাম? নাকি হালাল? 'হালাল'।

এইবার বাবা মা আকাশ পাতাল ভেঙে ফেলে দিবে। যে,"হারাম করছিলি,করছিলি।" "তুই হালাল কাজটা কেন করলি?"

আপনারা হাসছেন??

বড় আফসোস লাগে ভাইয়েরা,বড় আফসোস লাগে।

আমার এক ছাত্র বুয়েটে পড়ে। ইঞ্জিনিয়ার, খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। বাবা মা দ্বীনদার। ওকে হিফজখানায় দিয়েছিল,হাফিজও হয়েছিল। এরপর আলিম পাশ করে বুয়েটে গিয়েছে। দাড়ি আছে। আমার সাথে 'প্রশ্ন উত্তর' শিক্ষার একটা সম্পর্ক আছে। আমাকে বলতেছে-স্যার, এবার ফোর্থ ইয়ার শেষ করবো।
স্যার, এতোদিন পাপের ভয় হতো। খুব চেষ্টা করেছি পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করার। এখন পাপ ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু বাড়িতে যদি বিয়ের কথা বলি, মনে হয় যেন আসমান ভেঙে পড়েছে। বুয়েট থেকে অনার্স পাশ করেছে, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, এখন বিয়ে কেন?
আরো দশ বছর যাক, তুই আরো ডিগ্রি কর, পিএইচডি কর,প্রতিষ্ঠিত হ। এরপর ৩৫-৪০এ বিয়ে শাদি করবি।

যখন আর বিয়ের দরকারই থাকবেনা! -তাহলে এখন কি হবে? এখন যিনা করবি!

তো এই হলো দ্বীনদার সমজের অবস্থা।
আপনার ছেলে, আপনার মেয়ে বিয়ে করতে চাইলে আপনার কষ্ট লাগে।আর ওরা অবৈধ রিলেশন করে,তাতে আপনার কষ্ট লাগেনা।
আপনি ইহুদী, খ্রিস্টানদের ষোল আনাই আধিপত্য মেনে নিয়েছেন।
আপনি হয়ত নামাজ পড়ছেন, রোযা রাখছেন, আপনি শবে বরাত করছেন, আপনি হুজুরদের ওয়াজ শুনছেন।
মনে করছেন, 'মাশাল্লাহ', আমি কতবড় মুসলমান। কিন্তু সন্তানের প্রতি দায়িত্বের এই অবহেলায় আপনাকে আল্লাহর কাছে পাকড়াও হতে হবে।
আল্লাহ হেফাজত করুন,আমীন।

-ড. আব্দুল্লাহ জাহাঈীর।(রাহিমাহুল্লাহ)

Decoding life

▫️True #freedom comes when you free yourself from the slavery of-
"what would people say" and "social images"..
 
▫️True #courage comes when you fear your maker alone,
and no one else !
 
▫️True #gain can even reside within
material failures! 
when you don't lose your morals in the process..
 
▫️True #loss is when you sacrifice your morals,
just to grab a few trophies of material success!
 
▫️True #relief is when you finally realize-
everything that begins in this 'life',
comes with an inevitable "expiration date"..
 
 
(original writeup)

আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে উওম আখলাক গঠনের তোফিক দান করুক।আমিন

৫০ মিনিট সালাত আদায়, তাহাজ্জুদ পরা, যদিও তপ্ত বালুর বুকে দাঁড়িয়ে পড়েন যত টা কঠিন,,তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন উত্তম আখলাক ধারণ করে ১০-১৫ মিনিট সবর করা।

কেউ আপনার মুখের উপর থুথু দিল।আপনি জুতা খুলে তেড়ে এলেন বা তাকেও থুথু দিলেন।এটা অনেক ইজি। কঠিন হল, সবর করা,ক্ষমা করা,চুপ থাকা।

সুন্নত অনুযায়ী লেবাস পরা,কপালে সিজদাহ এর দাগ ওয়ালা বহু মানুষ আছে। কিন্তু উত্তম আখলাকের মানুষ দেখি খুব কম,যার সংস্পর্শ এ এলে হৃদয় শীতল হয়,পজিটিভ কিছু শেখা হয়।

আমার আখলাক মোটেও উত্তম না। একদম অধম থেকে একটু উপরে উঠার চেষ্টা করছি।

আশেপাশে অনেক টক্সিক মানুষ,নোংরা মানুষ। আমার চেয়ে বয়সে, জ্ঞানে,পজিশন এ অনেক বড় বড় মানুষ এর ও দেখি এই মেন্টালিটি যে কিভাবে এই মেয়ে /ছেলে কে টিজ করা যায়,পোক করা যায়।
তার পজিশন অনেক নিচে,আমি যা বলব সে সহ্য করতে বাধ্য।

কিন্তু এখানে ইকুয়েশন এ সেই মহান সত্তার কথা,আমার রাব্বের কথা ভুলে যাচ্ছেন যিনি আপনার,আমার মত অধমকে জবান দিয়েছেন,যিনি বিচারক দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।
ধরলাম আমি অনেক পাপী, কিন্তু আমি চুপ থাকলাম। সবরের খাতায় কিছু যোগ হল।আপনি যে নোংরামি করলেন তা আপনার গুনাহের খাতায় যোগ হল।


এই দুনিয়ায় ২ দিনের বাদশাহ হয়ে আপনার কি এমন লাভ হল? আর ২ দিনের গোলাম হয়ে,বাঁদী হয়ে আমার কি ক্ষতি হল?

সেই দিনকে ভয় করেন যেইদিন আমলনামা খুলে দেখাবে। আমার খাতায় আমার সবর, আপনার টায় আপনার গুনাহ থাকবে(যদি আল্লাহ ক্ষমা না করেন)।

বদদুয়া দিতে হয় না,কিছু দুয়া অন্তরের "হায়" হিসেবে বেরিয়ে যায়।

আমার রাব্ব সূক্ষ্ম হিসাব গ্রহণকারী,আমার আপনার রাব্ব কে ভয় করুন।
আমার রাব্ব তো ন্যায় বিচারকারী।তাঁকে ভয় করুন।

আমাকেও ভয় করুন( মজলুম হিসেবে),,আমার মনের "হায়" ও আল্লাহ শুনেন।তিনিই আস-সামি'।
আমার হায় যদি গেঁথে যায়,আমার চোখের পানি, মনের অস্থিরতা যদি আল্লাহ কবুল করে নেন???


এইজন্য আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে উওম আখলাক গঠনের তোফিক দান করুক।আমিন

 Genuine Post Link  Click HERE

আল্লাহ্‌র মনোনীত জীবন ব্যবস্থায় সুদ : পর্ব ৫ - রিবার পরিচয় ৩

[পর্ব ৪: http://goo.gl/O7kDU1]  


গত পর্বে আমরা রিবা আল ফাদল নিয়ে প্রথম ধাপের আলোচনা করেছি। এই পর্বে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা করা হল।  


আমরা এখন জানলাম রিবাউই পণ্য হাদীসে উল্লিখিত ৬ টি পণ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যেসকল পণ্যের মাঝে রিবাউই পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে, সেসকল পণ্যই রিবাউই পণ্য হিসেবে গণ্য হবে। এখন আমরা রিবাউই পণ্যের পারস্পরিক বিনিময়ের কিছু হুকুম আরেকটু বিশ্লেষিত আকারে দেখব, যা পূর্বে অল্প আলোচনা করা হয়েছে।


রিবাউই পণ্যের পারস্পরিক লেনদেনের মূলনীতিগুলো ইমাম নববী বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে এনেছেন। তা নিম্নরূপ:

  • যদি দুটো পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়, তাহলে পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ/কম ও বাকি রাখা উভয়ই জায়েয। যেমন, টাকার বিনিময়ে চাল ক্রয় করা। এক্ষেত্রে চালের পরিমাণ আর টাকার পরিমাণ এক হতে হবে কথা নেই এবং আপনি চাইলে বাকিতেও চাল কিনতে পারেন।

  • যদি দুটো পণ্য একইরকম হয়, তাহলে পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ/কম ও বাকি রাখা উভয়ই নাজায়েয। যেমন, বাংলাদেশি টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি টাকা ক্রয় করা। পুরানো টাকা দিয়ে নতুন টাকা কেনা আমরা প্রায়ই দেখি। সাধারণত নতুন ১০০ টাকার নোট কিনতে পুরোনো ১১০ টাকা দিতে হয়। কিন্তু এটা রিবা। হালাল লেনদেন হতে হলে এক্ষেত্রে পুরোনো আর নতুন উভয় টাকার মূল্য সমান হতে হবে। অর্থাৎ ১০০ টাকার নতুন নোট কিনতে হলে বিনিময়ে পুরোনো নোট ১০০ টাকাই দিতে হবে। বেশি বা কম দেয়া যাবে না। এছাড়া এই লেনদেন বাকিতে করা যাবে না। আপনি বলতে পারেন না, “আমাকে নতুন ১০০ টাকার নোট দাও, আমি তোমাকে এখন ৫০ টাকার পুরনো নোটটা দিলাম, বাকি ৫০ টাকা আগামীকাল দেব।”

  • যদি দুটো পণ্য ভিন্ন রকম হয় কিন্তু মূল বৈশিষ্ট্য একই হয়, তাহলে বেশ/কম জায়েয, কিন্তু বাকি রাখা নাজায়েয। যেমন, বাংলাদেশি টাকা দিয়ে ইউএস ডলার কেনা। আপনি বাংলাদেশি ৮০ টাকা দিয়ে ইউএসএ এর ১ ডলার কিনতে পারেন, অর্থাৎ বেশ/কম করতে পারেন, তবে তা একই মাজলিস বা সেশানে হতে হবে। বাকি রাখা যাবে না। আপনি আজকে বাংলাদেশি ৮০ টাকা দিলেন, ইউএস ১ ডলার আগামীকাল নেবেন, এটা হতে পারবে না। 


ইমাম নববীর মূলনীতির দ্বিতীয় যে নীতি, অর্থাৎ সমজাতীয় পণ্যের পারস্পরিক লেনদেনের বিষয়টি আরেকটু বিশ্লেষণ করা যায়। এই ধরণের বিনিময়ে মূলত চারটি বিষয় বিবেচনাধীন থাকে। আর সেসব হল:

  • সমজাতীয় পণ্য পরস্পর বিনিময় করার ক্ষেত্রে উন্নত-অনুন্নত ভেদাভেদ করা যাবে না। অর্থাৎ, নতুন স্বর্ণের সাথে পুরাতন স্বর্ণের বিনিময়ের ক্ষেত্রে কম-বেশ করা যাবেনা। সমান সমান হতে হবে। তেমনি উন্নত মানের চালের বিনিময়ে নিম্ন মানের চাল নেয়ার ক্ষেত্রেও কম-বেশ করা যাবে না। সমান সমান হতেই হবে। এক্ষেত্রে ‘বাজার মূল্য’ মাথায় রাখা চলবে না। একটু আগে যে নতুন টাকা ও পুরোনো টাকার উদাহরণ দিয়েছি, সেটাও এই হুকুমের অধীন।
তবে শরীয়ত এই ক্ষেত্রে একটি সমাধান দেয়। সেটি হল, যদি পণ্যগুলো বিক্রয়যোগ্য হয়, তবে একটি পণ্য বিক্রি করে দিয়ে তা টাকায় রূপান্তর করে, তারপর অন্য পণ্যটি কেনা যায়। ফলে আর রিবায় লিপ্ত হবার সম্ভাবনা থাকে না। যেমন, যদি ভালো মানের এক কেজি গম, আর একটু নিম্ন মানের দুই কেজি গমের মাঝে  বিনিময় করা হয়, সেটা হবে রিবা। এক্ষেত্রে সমাধান হল, নিম্ন মানের ২ কেজি গমকে বাজারে বিক্রি করে দিয়ে যে টাকা পাওয়া যাবে, সেই টাকা দিয়ে ভালো মানের  এক কেজি গম কেনা।  
  • সমজাতীয় পণ্য যদি একইরূপ হয়, তাহলে লেনদেনে কোনরূপ বেশ/কম করা যাবে না। ধরা যাক, আপনার কাছে কিছু স্বর্ণ আছে আর আপনি সেই স্বর্ণের বিনিময়ে একটি শো-পীস এর দোকান থেকে সম্পূর্ণ স্বর্ণের তৈরি একটি শো-পীস কিনতে চান। এই ক্ষেত্রে আপনাকে সেই স্বর্ণের শো-পীস কিনতে সমপরিমাণ স্বর্ণ দিয়েই কিনতে হবে। যদি শো-পীসটি ১ ভরি ওজনের স্বর্ণ দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে তা আপনাকে ১ ভরি স্বর্ণের বিনিময়েই কিনতে হবে। অথবা আপনার স্বর্ণকে আগে বিক্রি করে টাকায় রূপান্তর করে তারপর শো-পীসটি কিনতে হবে।  
  • সমজাতীয় পণ্য যদি বৈশিষ্ট্যগত ভাবে কোনরকমের ভিন্ন বস্তুতে পরিণত হয়, অর্থাৎ দুটি সমজাতীয় পণ্যের মাঝে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা যায়, তাহলে বেশ/কম করা জায়েয। অর্থাৎ, যদি একটি পণ্য কাঁচামাল হয়, আর অপর পণ্যটি সেই কাঁচামাল দ্বারা প্রস্তুত কোন বস্তু হয়, এক্ষেত্রে বেশ/কম করা যাবে। যেমন, ইঞ্জিন তৈরি হয় লোহা লক্কড় দিয়ে। এখন লোহার বিনিময়ে কেউ যদি কোন একটি ইঞ্জিন নিতে চায়, তাহলে সেক্ষেত্রে বেশ/কম করা যাবে, যেহেতু শিল্পায়নের ফলে লোহার মৌলিক অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেছে। ঠিক একই ভাবে তুলার সাথে সুতা কিংবা সুতার সাথে কাপড়ের লেনদেনের ক্ষেত্রেও এই হুকুম প্রযোজ্য। 
  • সমজাতীয় পণ্য যদি সোনা, রূপা বা মূদ্রা জাতীয় বস্তু হয়, অর্থাৎ বিনিময় মাধ্যম হয়, তাহলে পারস্পরিক লেনদেনের সময় নগদ তো হতে হবেই, সাথে উভয় পক্ষ নিজ নিজ পণ্যের উপর দখল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একে বলা হয় কাব্দ (বাংলায় কবজা বলা চলে)। অর্থাৎ স্পষ্টভাবেই তা দখলে চলে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যায়েদ তার ৫০ ভরি রূপা যদি উমারের ৭ ভরি স্বর্ণের সাথে বিনিময় করতে চায়, তাহলে উভয়কেই নগদ বিনিময় করে স্পষ্টভাবেই সোনা ও রূপার দখল নিতে হবে। অর্থাৎ, যায়েদ ৭ ভরি স্বর্ণ তার কব্জায় নিয়ে নেবে আর উমার ৫০ ভরি রূপা তার কব্জায় নিয়ে নেবে। মূল বিষয় হল যায়েদ বা উমার উভয়েই নগদ বিনিময় করলেও, তা যদি নিজেদের কব্জায় নিয়ে না আসে, তাহলে লেনদেন শুদ্ধ হবে না। কিন্তু অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে এই কড়াকড়ি প্রযোজ্য নয়। যেমন, ফয়সাল যদি এক কেজি লবন যুবাইর এর আধা কেজি চিনির সাথে বিনিময় করে, তাহলে উভয়েই যদি নিজেদের পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণের দিকে নির্দেশ করে বলে, “আমরা বিনিময় করলাম” আর যদি ফয়সাল চিনির আর যুবাইর লবণের স্পষ্ট দখল না নিয়ে বলে “কিছুক্ষণ পর নিচ্ছি”, তাহলে এই বিনিময় শুদ্ধ। কিন্তু মূদ্রা জাতীয় পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে স্পষ্টভাবেই দখলে নিয়ে নেয়া জরুরী।     

 [এই পর্বের মাধ্যমে রিবা নিয়ে মৌলিক আলোচনা শেষ হল। আগামী পর্বগুলোতে বর্তমান ইকোনমিতে রিবার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।] 


     
ওয়াল্লাহু তা'আলা আ'লাম

আল্লাহ্‌র মনোনীত জীবন ব্যবস্থায় সুদ : পর্ব ৪ - রিবার পরিচয় ২

[পর্ব ৩: http://goo.gl/97Wbe2]  


গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছি রিবার প্রথম প্রকার - রিবা আন নাসিআ নিয়ে। এ পর্বে আমরা আলোচনা করবো রিবার দ্বিতীয় প্রকার - রিবা আল ফাদল নিয়ে।


রিবা আল-ফাদল [ ربا الفضل] 

রিবার সবচাইতে ব্যপক প্রকার হল রিবা আল-ফাদল। রিবা আন-নাসি’আতু যেমন সহজবোধ্য আর পরিষ্কার, রিবা আল-ফাদল সে তুলনায় কিছুটা জটিল। এই প্রকারের রিবা যেহেতু হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত, তাই একে অনেক ফকীহ রিবা আল হাদীসও বলেছেন। 

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, বিশেষ কোন পণ্য, সমজাত পণ্যের সাথে বিনিময় করার সময় যা অতিরিক্ত নেয়া হয়।

রিবা আল ফাদল মূলত যেই হাদীসের উপর ভিত্তি করে হারাম করা হয়েছে, তা নিম্নরূপ।


“সোনার বিনিময়ে সোনা সমান সমান বিক্রয় কর।
রূপার বিনিময়ে রূপা সমান সমান বিক্রয় কর।
খেজুরের বিনিময়ে খেজুর সমান সমান বিক্রয় কর।
গমের বিনিময়ে গম সমান সমান বিক্রয় কর।
লবণের বিনিময়ে লবণ সমান সমান বিক্রয় কর।
যবের বিনিময়ে যব সমান সমান বিক্রয় কর।
যে বেশি আদানপ্রদান করলো সে রিবা আদান প্রদান করলো। আর রূপার বিনিময়ে স্বর্ণ যেভাবে ইচ্ছা, সে ভাবেই বিক্রয় করতে পারো। তবে শর্ত হল হাতে হাতে হতে হবে এবং খেজুরের বিনিময়ে যব যেভাবে ইচ্ছা বিক্রয় করতে পারো, শর্ত হল হাতে হাতে হতে হবে।” [তিরমীদির বর্ণনা]


এই হাদীসে ছয়টি বিশেষ পণ্যের কথা এসেছে, যেসব পণ্যের বিনিময়ের সময় একই জাতের হয়ে থাকলে একদম সমান সমান হতে হবে। অর্থাৎ ১০ গ্রাম সোনার বিনিময়ে ১১ গ্রাম সোনা দেয়া যাবে না। ১০ গ্রামই দিতে হবে। তেমনি ১০ গ্রাম রূপার বিনিময়ে ১১ গ্রাম রূপা দেয়া যাবে না। ১০ গ্রামই দিতে হবে। তেমনি খেজুর, গম, লবণ ও যবের স্বজাতি বিনিময়ের একই হুকুম। যেমন ১ কেজি খেজুরের বিনিময় ১ কেজি খেজুরের সাথেই হতে হবে। ১ কেজি ১ গ্রাম এর সাথেও হতে পারবে না।

অন্যদিকে, যদি সোনার সাথে রূপার কিংবা খেজুরের সাথে লবণের বিনিময় হয়ে থাকে, অর্থাৎ একই জাতের মধ্যে বিনিময় না হয়ে ভিন্ন জাতের মধ্যে বিনিময় হয়ে থাকে, তবে কম বেশি করা যাবে, তবে অবশ্যই তা নগদে হতে হবে। অর্থাৎ হাতে হাতে হতে হবে। বাকিতে করা যাবে না।

ইসলামি বেচা-কেনা পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল মাজলিস। এর চলতি ভাষায় সহজ অর্থ করা যায় সেশান। অর্থাৎ একটি বেচাকেনা যেই সেশানের মধ্যে সম্পন্ন হয়, তাকে বলা হয় মাজলিস। মাজলিসের ওপর বেচাবিক্রির অনেক হুকুমই নির্ভর করে। এখানে রিবা আল ফাদল এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মাজলিসের হুকুম হল, যদি উক্ত ৬ জাতের পণ্য পরস্পর বিনিময় করা হয়, অর্থাৎ, একই প্রকারের পণ্য পরস্পর বিনিময় করা হোক (যেমন, সোনার বিনিময়ে সোনা, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর) আর ভিন্ন প্রকারের পণ্য বিনিময় করা হোক (যেমন, সোনার বিনিময়ে গম, রূপার বিনিময়ে খেজুর, সোনার বিনিময়ে রূপা) তাহলে তা একই মাজলিসে সম্পন্ন হতে হবে। অর্থাৎ বাকি রাখা যাবে না।


আমওয়ালুর রিবায়াত

ফিকহের পরিভাষায় হাদীসে উল্লিখিত ৬ ধরণের পণ্যকে, সোনা, রূপা, খেজুর, গম, লবণ, যব - আমওয়ালুর রিবায়াত বা সুদী পণ্য বা রিবাউই পণ্য বলা হয়। কেননা এইসব পণ্যের পরস্পর বিনিময়ের ফলেই সুদ তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে।

তবে হাদীসে এটার উল্লেখ নেই, যে শুধুমাত্র এই ৬ পণ্যই কি তাহলে রিবাউই পণ্য বলে বিবেচ্য হবে?

এটি অনেক জটিল একটি প্রশ্ন, যার উত্তরে উলামা কিরাম মতপার্থক্য করেছেন। প্রাথমিক যুগের অনেক ফকীহ এর মত ছিল রিবাউই পণ্য শুধুমাত্র এই ৬টি পণ্যেই সীমাবদ্ধ। এর মাঝে আছেন কাতাদা (রহ) ও তাউস (রহ)। তবে অন্যান্য ফকীহগণ এর সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। পরবর্তী ফকীহদের কথা হল, আমাদের দেখা উচিৎ, এই ৬টি পণ্যের মাঝে আসলে মূল মিল কোন জায়গায়, অর্থাৎ এদের মূল বৈশিষ্ট্য কী। যদি কোন পণ্যের মাঝে ঐ মৌলিক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, তাহলে সেটিও রিবাউই পণ্য হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে সালাফ উস সালেহীনগণ কয়েকটি মত দিয়েছেন।

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ) বলেন, এই ৬ পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল পরিমাপ ও ওজন। অর্থাৎ এই ৬ টি পণ্যকে পাত্র দারা পরিমাপ করা যায় ও ওজন করে বিক্রি করা যায়। তাই অন্য যে কোন পণ্য যদি পাত্র দ্বারা পরিমাপ করা যায় আর ওজন করে বিক্রি করা যায়, তাহলে সেটাও রিবাউই পণ্য হবে। 
  • ইমাম মালিক (রহ) বলে, এই ৬ পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল খাদ্য জাতীয় হওয়া এবং গুদামজাত করা উপযুক্ত হওয়া। তাই যে কোন পণ্য যা খাওয়া যায় কিংবা গুদামজাত করা যায়, সেটাই রিবাউই পণ্য। 
  • ইমাম শাফিঈ (রহ) বলেন, এই ৬ পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল খাদ্যবস্তু হওয়া ও মূদ্রা জাতীয় হওয়া। সোনা-রূপাকে মূদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা যায় ও বাকি ৪ টি খাদ্য হিসেবে খাওয়া যায়। তাই যে কোন বস্তু যা মূদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিংবা খাবার হিসেবে খাওয়া যায়, সেটিই রিবাউই পণ্য হবে।  
  • ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল (রহ) এর কাছ থেকে তিনটি মত পাওয়া যায়। যার একটি ইমাম আবু হানিফার (রহ) অনুরূপ, একটি ইমাম শাফিঈ (রহ) এর অনুরূপ এবং তৃতীয়টি তার নিজস্ব মত যা হল, সোনা-রূপা ছাড়া অন্য যে কোন পণ্যের মধ্যে যদি খাদ্য জাতীয় হওয়া, পরিমাপ করে ও ওজন করে বিক্রি করা – এই তিনটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, তাহলে তা রিবাউই পণ্য হিসেবে গণ্য হবে।

কাজেই আমরা দুইরকম পণ্য পেলাম।
প্রথমটি হল, যেসব পণ্য বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
দ্বিতীয়টি হল, খাদ্যজাতীয় পণ্য যা ওজন আর পরিমাপ করে বিক্রি করা যায়।

তাই যেসব পণ্য বিনিময় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং যেসব খাদ্যজাতীয় পণ্য ওজন ও পরিমাপ করে বিক্রি করা যায়, সেইসব পণ্যকেই রিবাউই পণ্য বিবেচনা করে তার উপর রিবা সংক্রান্ত হুকুম বিবেচনা করতে হবে।

[এই পর্বে রিবা আল ফাদল নিয়ে প্রথম ধাপের আলোচনা করা হল। পরবর্তী পর্বে এর দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ]  


ওয়াল্লাহু তা'আলা আ'লাম

আল্লাহ্‌র মনোনীত জীবন ব্যবস্থায় সুদ : পর্ব ৩ - রিবার পরিচয় ১

পর্ব ১: http://goo.gl/IhWcQi
পর্ব ২: http://goo.gl/juXI56 


আমরা গত পর্বে ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় ‘রিবা’ এর অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেছি। কুর'আন ও সুন্নাহ-এর অকাট্য দলীলের মাধ্যমে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই, ইসলামে রিবাকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই পর্বে আমরা আলোচনা করবো রিবার পরিচয় নিয়ে।

আলোচনার শুরুতেই যে বিষয়টা জানা প্রয়োজন, তা হল ইসলামে রিবা শব্দটি একটি ব্যপক অর্থবোধক শব্দ। আমরা অনেকেই রিবা বলতে শুধু সুদ বুঝে থাকি। অর্থাৎ ইংরেজি Interest বা usury বুঝে থাকি। কিন্তু বাস্তব কথা হল রিবা শুধু সুদ শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আরো অধিক কিছুই বোঝায়। বিভিন্ন গ্রন্থে ফকীহগণ রিবা শব্দের ৫ রকম ব্যবহার উল্লেখ করেছেন।


  • সুদ। এ নিয়ে আলোচনা আসছে।

  • পণ্য বিনিময়ে বেশি/কম করা। এ নিয়েও আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।

  • ক্রয়-বিক্রয়ে বিভিন্ন অবৈধ পন্থা অবলম্বনের খেত্রেও রিবা শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন, সূরা নিসার ১৬১ নাম্বার আয়াত “আর এ কারণে যে, তারা রিবা গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায় ভাবে।” এর তাফসীরে কতিপয় মুফাসসিরগণ ‘রিবা’র তাফসীর করেছেন ক্রয়-বিক্রয়ে অবৈধ পন্থা হিসেবে।

  • প্রতিদান পাওয়ার আশায় কাউকে কিছু দেয়ার ক্ষেত্রেও রিবা শব্দটি ব্যবহার হতে পারে। যেমন সূরা রূমের ৩৯ নাম্বার আয়াত “মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় তোমরা ‘রিবা’তে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না” এর তাফসীরে অনেক মুফাসসির রিবাকে এই অর্থেই নিয়েছেন।

  • যে কোন হারাম কাজের ক্ষেত্রেও রিবা ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন ‘কানযুল উম্মাল’ এ একটি হাদীস পাওয়া যায়, যেখানে বলা হচ্ছে, “সবচাইতে নিকৃষ্ট রিবা হল এক ভাই আরেক ভাই এর মান-মর্যাদা ক্ষুন্ন করা।”

তবে শেষ তিন প্রকারে রিবা শব্দের ব্যবহার নেই বললেই চলে কিংবা একেবারেই অপ্রচলিত।


আরবী ভাষায় ربا (রিবা) এর শাব্দিক অর্থ হল আধিক্য, বৃদ্ধি, অতিক্রম করা, আকার ও সংখ্যায় কোন কিছু বৃদ্ধি পাওয়া। আহকামুল কুর’আন গ্রন্থে ইবনুল আরাবী বলেন, “রিবার আভিধানিক অর্থ হল বৃদ্ধি।”

তাই ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয়ে অতিরিক্ত নেবার ক্ষেত্রে কিছু কিছু অতিরিক্ত নেওয়াকে ইসলামে রিবা বলা হয় এবং তা হারাম করা হয়েছে। তবে সব প্রকার অতিরিক্ত গ্রহণই রিবা নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু প্রকার অতিরিক্ত গ্রহণই হল রিবা।


ইসলামে ব্যবসা ও বিনিময় সংক্রান্ত মুয়ামালাতে রিবা মূলত দুই রকম।

১। রিবা আন–নাসি’আতু [ربا النسيئة]

২। রিবা আল-ফাদল [ربا الفضل]




রিবা আন–নাসি’আ [ربا النسيئة]


রিবা আন-নাসি’আকে অনেক ফকীহ রিবা আল-কুর’আন [ربا القران] হিসেবেও নামকরণ করেছেন কেননা এই ধরণের রিবার কথা সরাসরি কুর’আনে এসেছে।

এই প্রকারের সুদের সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য, সালাফ আস সালেহীনের বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে সহজবোধ্য হয়ে যায়।


আলী (রা) বলেছেন,

“যে ঋণ লাভ টেনে আনে, তাই সুদ”। [আল ‘আযীযী (হাসান লি ঘাইরিহী), আসসিরাজুল মুনীর, মিসর]

ফুযালা ইবন উবাইদ (রা) বলেছেন, “যে ঋণ লাভ টেনে আনে, তা এক প্রকারের সুদ” [বাইহাকী]

ইমাম আবূ বাকর জাসসাস রাযী রিবা আন-নাসি’আকে রিবা আল-কুর’আন নামকরণ করে বলেন,

“মেয়াদের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের শর্তে যে ঋণ দেয়া হয়, তাকে রিবা আল-কুর’আন বলে” [আহকামুল কুর’আন, মিসর]

ইবন জারীর বলেন,  “জাহিলী যুগে প্রচলিত ও কুর’আনে নিষিদ্ধ রিবা হল কাউকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণ দিয়ে মূলধনের অতিরিক্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা।” [তাফসীর ইবন জারীর]


আরবী ভাষার সুপ্রসিদ্ধ পণ্ডিত আবূ ইসহাক যাজ্জাজ রিবা আন নাসি’আকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এইভাবে,

“প্রদত্ত ঋণের পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত উসূল করাই হল রিবা” [তাজুল ‘উরূস]



উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোকে সহজ করে বলতে গেলে যা দাঁড়ায় তা হল, ঋণ দিয়ে সেই ঋণ ফেরত নেবার সময় চুক্তি মোতাবেক কেউ যদি ১ পয়সাও অতিরিক্ত গ্রহণ করে, তবে সেই ১ পয়সা হবে রিবা আন-নাসি’আ। অর্থাৎ ঋণের মূলধনের সাথে কেউ যদি অতিরিক্ত কোন অর্থ আদায় করে, তবে সেটাই রিবা।

এখানে স্পষ্ট একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন, সেটি হল ইসলামে ঋণের ধারণা খুবই সহজ। ইসলামের ঋণের কোন অতিরিক্ত ফায়দা আসতে পারে না। অর্থাৎ কেউ যদি কাউকে ১০০ টাকা ঋণ দেয়, নির্দিষ্ট সময় পরেও সেই টাকা ফেরত নিতে গেলে তাকে ১০০ টাকাই ফেরত নিতে হবে। ১০১ টাকাও নিতে পারবেনা। এই কারণে ইসলামে ঋণের প্রকারভেদ একটাই। আর সেটা হল কারদ আল-হাসানা। ইসলামে এই কারদ আল-হাসানা ব্যতীত কোন প্রকার ঋণের স্থান নেই। অর্থাৎ ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত অর্থসহ তা ফেরত নেয়া ইসলামে কোন ক্রমেই জায়িয নয়, এবং কেউ যদি এইভাবে ঋণ ফেরত নিয়ে থাকে, তবে সেটা রিবা আন-নাসি’আ। যেমনটা আমরা সালাফদের সংজ্ঞা থেকে জানলাম। এখানে আরো বলে রাখা প্রয়োজন, আমরা আমাদের সমাজে সুদ বলতে যা বুঝি, তা মূলত রিবা আন-নাসি’আ। অর্থাৎ এক প্রকারের রিবা। রিবা মানেই শুধু সুদ নয়। বরং রিবা আন-নাসি’আ মানে সুদ।


উল্লেখ্য, ঋণের অতিরিক্ত আদায় রিবা হবে তখনই, যখন তা চুক্তিতে উল্লেখ করা থাকবে। কিন্তু চুক্তির বাইরে কেউ যদি স্বেচ্ছায়, উপহার হিসেবে কাউকে অতিরিক্ত দান করে, সেক্ষেত্রে তা হিবা বা গিফট হিসেবেই গণ্য হবে। রিবা নয়।


জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের কাছে আসি যখন তিনি মাসজিদে ছিলেন আর আমাকে বললেন, ‘দুই রাকাত পড়ে নাও’। আমি তার পাওনাদার ছিলাম, তাই তিনি আমার পাওয়া ফেরত দিলেন আর কিছু অতিরিক্তও দিলেন।” [বুখারী ৪৪৩]

এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম এক ব্যক্তির কাছে একটি বাচ্চা উট ধার নেন। ফেরত দেবার সময় সাহাবীরা ঐ বাচ্চা উটটি খুঁজে পেলেন না। পরিবর্তে পেলেন এমন একটি উট যা কিছুটা যৌবন প্রাপ্ত ও হৃষ্টপুষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বললেন, “(এটিকেই) দিয়ে দাও। তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে ধার শোধে উত্তম।” [বুখারী ২৩০৫]


হাদীসদ্বয় থেকে জানা যায়, এই অতিরিক্ত দান যদি চুক্তিতে উল্লেখ না থাকে, এবং তা দেনাদারের স্বেচ্ছায় ও খুশিতে হয়ে থাকে, তাহলে এই অতিরিক্ত প্রদান-গ্রহণ করা জায়িয। আর যদি চুক্তি করা থাকে, যে ফিরিয়ে দেবার সময় কিছু অতিরিক্ত দিতে হবে, তবে সেটা রিবা আন-নাসি’আ এবং তা হারাম।


আরো বিস্তারিতভাবে বলা যায়, যদি কোন ব্যক্তি কাউকে ঋণ দেবার সময় এই বলে ঋণ দেয়, যে ফেরত দেবার সময় অতিরিক্ত কিছু দিতে হবে, তাহলে এই অতিরিক্ত হল রিবা আন নাসি’আ। আর যদি কোনরূপ কিছুই বলা না থাকে বা চুক্তি করা না থাকে, অর্থাৎ কারদ আল-হাসানা দেয়, কিন্তু ঋণ গ্রহীতা নিজ খুশিতেই ফেরত দেবার সময় উত্তম কিছু বা অতিরিক্ত কিছু দেয়, তাহলে এটি রিবা নয়।



[এই পর্বে রিবা আন-নাসি’আ নিয়ে আলোচনা করা হল। পরবর্তী পর্বে রিবার দ্বিতীয় প্রকার – রিবা আল-ফাদল নিয়ে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ্‌]


এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞানী

আল্লাহ্‌র মনোনীত জীবন ব্যবস্থায় সুদ : পর্ব ২ – সুদ ও ইসলাম

[প্রথম পর্বের লিংক: http://goo.gl/IhWcQi] 


আমরা গত পর্বে জেনেছি ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি হল সম্পদের সুষম বন্টন। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার অর্থনীতির তত্ত্ব যদিও সেই কথাই বলে, তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, সম্পদ কেবল বিত্তশালীদের হাতেই ঘুরপাক খায়। অথচ সম্পদ যাতে শুধুমাত্র বিত্তশালীদের হাতে পুঞ্জিভূত না হয়, সেটার দিকেই মূল লক্ষ্য রাখে ইসলামি অর্থনীতি। আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন,


"আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রসূলের, তাঁর আত্নীয়-স্বজনের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্যে, যাতে ধনৈশ্বর্য্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়।" [সূরাহ হাশর: আয়াত ৭]


আর এই সম্পদের সুষম বন্টনের ক্ষেত্রে প্রধান যে বাধার মুখোমুখি হতে হয়, তা হল সুদ। সুদ এমনই একটি মারাত্মক জুলম, যা বিত্তশালীদের পকেট ভারী করে সাধারণ জনতাকে পথে বসিয়ে দেয়। সুদের বাস্তবিক অপকারিতা নিয়ে ইনশাআল্লাহ্‌ বিস্তারিত আসবে পরবর্তী পর্বগুলোতে।

ইসলামি অর্থনীতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হল, এটি সুদ অস্বীকার করে। সুদের অস্তিত্ব বিলীন করতে চায় এবং সুদকে হারাম ঘোষণা করে। অথচ আমাদের প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে সুদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই ইসলামে সুদের ব্যপারে কী বলা হয়েছে, কীভাবে সুদকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, কোন পর্যায়ে একে হারাম করা হয়েছে, আমাদের বর্তমান সুদী ব্যবস্থা এর সাথে কতটা যুক্ত, সে সংক্রান্ত জ্ঞান আহরণ করা প্রত্যকে ঈমানদার মুসলিমের উপর অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সুদের ব্যাপারে ইসলামের হুকুম যদি দেখা হয়, তাহলে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে স্পষ্ট আদেশ লক্ষ্যণীয়।



কুরআন মাজিদ ও সুদ

সুদের ব্যপারে আল্লাহ্‌ সুবহানাহুওয়া তা’লা কুরআনে একাধিক আয়াত নাযিল করেছেন। এইসব আয়াতে দেখার বিষয় হল, আল্লাহ্‌ আযাযা ওয়া জাল সুদকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেন নি এবং কঠোর ভাষায় হারাম ঘোষনা করে দিয়েছেন। কোন অবস্থাতেই আমরা সুদকে হালাল করার সুযোগ পাচ্ছি না।


“মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এই আশায় তোমরা সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দিয়ে থাকে, অতএব, তারাই দ্বিগুণ লাভ করে।“ [সূরাহ আর রূম: আয়াত ৩৯]

“বস্তুতঃ ইহুদীদের জন্য আমি হারাম করে দিয়েছি বহু পূত-পবিত্র বস্তু যা তাদের জন্য হালাল ছিল-তাদের পাপের কারণে এবং আল্লাহর পথে অধিক পরিমাণে বাধা দানের দরুন। আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায় ভাবে। বস্তুত; আমি কাফেরদের জন্য তৈরী করে রেখেছি বেদনাদায়ক আযাব।” [সূরাহ আন নিসা: আয়াত ১৬০ -১৬১]

“ঈমানদারগণ! তোমরা সুদের উপর সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো।” [সূরাহ আলি ইমরাআন: আয়াত ১৩০]

“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছেঃ ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লা’হ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।” [সূরাহ আল বাক্কারা: আয়াত ২৭৫]

“আল্লাহ তা’আলা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান খয়রাতকে বর্ধিত করেন। আল্লাহ পছন্দ করেন না কোন অবিশ্বাসী পাপীকে।” [সূরাহ আল বাক্কারা: আয়াত ২৭৬]

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।” [সূরাহ আল বাক্কারা: আয়াত ২৭৮]

“অতঃপর যদি তোমরা (সুদ) পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি অত্যাচার করো না এবং কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করবে না।” [সূরাহ আল বাক্কারা: আয়াত ২৭৯]


সুদের সাথে এইভাবেই সরাসরি সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন আল্লাহ্‌। বর্তমান সুদভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থায় ঋণ গ্রহীতার ওপর যদি ঋণ পরিশোধ কোন কারণে কষ্টকর হয়ে যায়, তাহলে ফাইনান্স হাউসগুলো তাকে ছাড় দেয় না। মর্টগেজ বা বন্ধক বিক্রি করে তারা সুদ ও আসল তুলে নিয়ে আসে। অথচ আল্লাহ্‌ বলছেন,


“যদি কেউ যদি অভাবগ্রস্থ হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” [সূরাহ আল বাক্কারা: আয়াত ২৮০]


লক্ষ্য করুন, ঋণ পরিশোধের সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে ঋণ দাতার অবশ্যই দাবি থাকে সেই ঋণের ওপর এবং বর্তমান ব্যবস্থায় ঋণ গ্রহীতার লেপ কম্বল বিক্রি করে হলেও সুদ আদায় করা হয়। কিন্তু আল্লাহ্‌ বলছেন তাকে সময় দিতে! কোন অবস্থাতেই যাতে তাকে অতিরিক্ত উসুল বা সুদের খপ্পরে পড়তে না হয়। যদিও ইসলামি ঋণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সুদমুক্ত।

তাই কুরআন মাজিদের আলোকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সুদের ব্যপারে এক বিন্দু ছাড় দেয়া সম্ভব নয়।



হাদীস ও সুদ

কুরআন এর আয়াতের আলোকে রাসূলুল্লাহ [ﷺ] একাধিকবার সুদের ব্যাপারে এই উম্মাহকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। দিয়েছেন অভিশাপ ও ভয়ঙ্কর শাস্তির খবর।


রাসূল সেই নারীকে অভিশাপ দিয়েছেন যে ট্যাটু আঁকা চর্চা করে এবং সেই নারী যে ট্যাটু আঁকায়, এবং সেই ব্যক্তি যে সুদ ভক্ষণ করে এবং যে সুদ দেয়।  [সহীহ আল বুখারী : ৫৩৪৭]

আল্লাহ্‌র রাসূল অভিশাপ দিয়েছেন সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, সুদের হিসাবরক্ষের এবং এ ব্যাপারে সাক্ষ্যদানকারীর ওপর আর বলেছেন “ওরা সকলেই সমান” [সহীহ মুসলিম ১৫৯৭]

সুদের ৭৩ টি অপকারিত রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বনিম্ন হল আপন মায়ের সাথে জিনা/ব্যভিচার করা।  [সুনান ইবন মাজাহ : ২২৭৪ {হাসান হাদীস (দারুস সালাম)। সোর্স: Sunnah.com}] 

রাসূল বলেন, “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে বেচে থাকো।” সাহাবীগণ বললেন, “হে আল্লাহ্‌র রাসূল! সেগুলো কী?” তিনি উত্তরে বললেন, “আল্লাহ্‌র সাথে শিরক করা,জাদু করা,অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ্‌ হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ গ্রাস করা, যুদ্ধের সময় পলায়ন করা, সতী-সাধ্বী নিরীহ ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করা।”  [সহীহ আল বুখারী : ৬৮৫৭]

আল্লাহ্‌র রাসূল যে ব্যক্তি সুদ নেয় ও যে ব্যক্তি সুদ দেয়, তাদের অভিশাপ দিয়েছেন [সহীহ মুসলিম : ১৮:১০৫]

আল্লাহ্‌র রাসূল বলেন, এমন একটি সময় আসবে, যখন সুদ খাবেনা এমন কেউ থাকবেনা, আর কেউ যদি সুদ নাও খায়, তবু এর ধূলোবালি থেকে রক্ষা পাবে না। [ইবন মাজাহ, আবু দাউদ, আল জামি’আল আসগার {সুয়ুতী, পৃষ্ঠা ৭৫৩১ : সহীহ (সোর্স: hdith.com)}]


রাসূল [ﷺ] এর হাদীস থেকেও দেখা যাচ্ছে সুদের হারাম হবার কথা। উল্লিখিত সহীহ হাদীসগুলো ছাড়াও আরো অসংখ্য হাসান পর্যায়ের ও কিছু দুর্বল বর্ণনার হাদীসও রয়েছে, যাতে বর্ণিত হয়েছে সুদের ভয়ানক পরিণতির কথা। কোনটায় আল্লাহ্‌র রাসূল [ﷺ]  বলেছেন তিনি মিরাজের সময় সুদখোরদের পেটে সাপ কিলবিল করতে দেখেছেন, কোনটায় তিনি বলেছেন একজন মুসলিমের এক দিরহাম সুদ গ্রহণ করা ৩৩ বা ৩৬ বার ব্যভিচার/জিনা করার চাইতেও জঘন্য।



ইসলাম ও সুদ

কুরআন ও হাদীসের আলোকে আলোচনার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, কোন মুসলিমের পক্ষে সুদকে হালাল ভাবার কোন সম্ভাবনা ও সুযোগ নেই। ইসলামে অত্যন্ত জঘন্য একটি স্থান দখল করে আছে সুদ। ভেবে দেখুন, কেউ তার জন্মদাত্রী মায়ের সাথে ব্যভিচার করতে পারে কি? সম্ভব? অথচ সুদ খাওয়ার ৭৩ টি গুনাহ এর সর্বনিম্ন গুনাহ হল সেই ব্যক্তির গুনাহ এর সমান, যে তাঁর জন্মদাত্রী মায়ের সাথে জিনা করে।

ভেবে দেখুন তো, কেউ একই দিনে ৩৬ বার জিনা করে ফেলেছে! কতটা ভয়ংকর হতে পারে তার গুনাহ? তার শাস্তি? অথচ এক দিরহাম সুদ গ্রহণকে ৩৬ বার জিনা করার চাইতেও জঘন্যতর আখ্যা দেয়া হয়েছে।

তাহলে আমাদের কি এতটুকু সতর্ক হবার প্রয়োজন নেই? আমাদের কি এতটুকু ভীত হবার দরকার নেই? আমাদের এতটুকু চিন্তা করার অবকাশ নেই যে আমরা সুদকে কীভাবে নিচ্ছি?

আসুন আমরা নিজেদের চারটি প্রশ্ন করি।

- আমরা কি সুদ নিচ্ছি?
- আমরা কি সুদ দিচ্ছি?
- আমরা কি সুদী কারবার লিখে রাখছি?
- আমরা কি সুদী কারবারে সাক্ষী থাকছি/ভূমিকা রাখছি?

এই চার শ্রেণীর মানুষকেই আল্লাহ্‌র রাসূল [ﷺ] অভিশাপ দিয়ে বলেছেন এরা সবাই একই গুনাহগার!

আমরা অনেকেই হয়তো নামায পড়ি, রোজা রাখি, কুরআন পাঠ করি, চেষ্টা করি হারাম কিছু না করতে, অথচ ঠিকই এমন ভাবে সুদী কারবারে জড়িয়ে পড়ছি, যেন এটা কোন বিষয়ই নয়!

অথচ যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে তা দিয়ে উদরপূর্তি করে, তার দু’আ কিংবা ইবাদাত কবুলই হয় না! রাসূলাল্লাহ [ﷺ] বলেন,


‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি শুধু পবিত্র বস্ত্তই গ্রহণ করেন। তিনি মুমিনদের সেই আদেশই দিয়েছেন, যে আদেশ তিনি দিয়েছিলেন রাসূলগণের।’’ আল্লাহ তা’আলা বলেন : ‘‘হে ইমানদারগণ! তোমরা পবিত্র বস্ত্ত-সামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসেবে দান করেছি।’’ অতঃপর রাসূল সা. এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলি-ধুসরিত ক্লান্ত-শ্রান্ত বদনে আকাশের দিকে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করে ডাকছেঃ হে আমার প্রভূ! হে আমার প্রভূ!  সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারা সে পুষ্টি অর্জন করে। তার প্রার্থনা কিভাবে কবুল হবে?’’ [সহীহ মুসলিম : ১০১৫]

আর যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা গড়ে উঠে তার জন্য দোযখের আগুনই উত্তম। [জামি’ আত তিরমিদি : ৬১৪ {হাসান হাদীস: দারুস সালাম (সোর্স: Sunnah.com)} ]


স্কলারদের মতে যে শরীর হারাম উপার্জনে পুষ্টি লাভ করে, সে শরীর আল্লাহ্‌র নিকট অপবিত্র। ফলে তাঁর ইবাদত কী উপায়ে কবুল করে পারে?


স্পষ্টতই সুদের ব্যাপারে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল [ﷺ] অত্যন্ত কঠোর নীতি অবলম্বন করেছেন। যে ব্যক্তি সুদের সাথে সম্পর্ক রাখে, আল্লাহ্‌ তা’লা বলেছেন সে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ও রাসূলুল্লাহর [ﷺ] সাথে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিম কখনই আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রাসূলের [ﷺ] সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করার কথা সুদূর কল্পনাতেও আনবেন না। কিন্তু সুদী কারবারে লিপ্ত হয়ে অনেকেই প্রতিনিয়ত আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের [ﷺ] বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন।

একজন মুসলিমের কাছে আল্লাহ্‌র আদেশ ও নিষেধের বাইরে কোন কিছুই বলার থাকে না, কোন কিছুই করার থাকে না। একজন মুসলিম সেটাই মেনে নেবে যা আল্লাহ্‌ আদেশ করেছেন। আর সেখান থেকেই দূরে থাকবে যা আল্লাহ্‌ নিষেধ করেছেন। আল্লাহ্‌ বলেন,

"আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট তায় পতিত হয়।" [সূরাহ আল আহযাব : আয়াত ৩৬]

অর্থাৎ আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রাসূল [ﷺ] যখন কোন বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন, তখন মু’মিন পুরুষ ও নারী কারোরই কোন এখতিয়ার নেই সেখানে দ্বিমত পোষণ করার।

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’লা সুদকে হারাম করেছেন তো আমরাও মেনে নেব। কোন প্রশ্ন ছাড়া। কোন তর্ক ছাড়া। আল্লাহ্‌ মুসলিমদের পরিচয় কুরআনে এভাবেই দিয়েছেন,


তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম। [সূরাহ নূর : আয়াত ৫১]


[এ পর্বে আমাদের আলোচনা ছিল সুদের হারাম হবার হুকুমের ওপর। পরবর্তী পর্বে সুদ ও রিবা এর সংজ্ঞা ও শ্রেণীবিন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ্‌।]  


এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞানী 

আল্লাহ্‌র মনোনীত জীবন ব্যবস্থায় সুদ : পর্ব ১ - জীবন ব্যবস্থা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

 
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা - এই বিষয়টা প্রতিটি মুসলিমই কম বেশি উল্লেখ করে থাকেন, বলে থাকেন, লিখে থাকেন। কিন্তু বুঝে থাকেন কজন, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ রয়ে যায়। কারণ জীবন ব্যবস্থা বা লাইফ সিস্টেমের কিছু সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা বলে দাবি করার সাথে সাথে অনুধাবন ও অনুসরণ করা জরুরী। অল্প ভাষায় বিস্তর বলা সম্ভব না হলেও যা উল্লেখ করা সম্ভব, তা হল যে কোন জীবন ব্যবস্থাই একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত জীবনে কিছু কোড বা নিয়ম কানুন সেট করে দিয়ে থাকে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত জীবন যাপনের নিয়ম, পারিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, সামাজিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবন ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে কিছু গৃহীত নিয়ম বা এক্সেপ্টেড নর্মস সেই জীবন ব্যবস্থায় ডিফল্ট হিসেবে থেকে থাকে। তাই ইসলামকে আমরা যখন জীবন ব্যবস্থা রূপে ঘোষণা করছি, তখন আমাদের বুঝে থাকা জরুরী, যে এইসব উপরোল্লিখিত বিষয়ে ইসলামের কোন নিয়ম, পরামর্শ কিংবা গাইডলাইন আছে কিনা।

এক্ষেত্রে, আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’লা কুরআনে উল্লেখ করেছেন,

“নিশ্চই আল্লাহ্‌র নিকট (গ্রহণযোগ্য/অনুমোদিত) জীবন ব্যবস্থা হল ইসলাম” [সূরাহ আলি ইমরান: আয়াত ১৯]


অর্থাৎ, বিচিত্র ধারার অসংখ্য জীবন ব্যবস্থাসমূহের মাঝে, আল্লাহ্‌ তা’লা কেবল মাত্র একটি জীবন ব্যবস্থাকেই রিকগনাইজ করেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, আল্লাহ্‌র কাছে দাম রাখে, গ্রহণযোগ্যতা রাখে শুধুমাত্র একটি জীবন পন্থা। আর তা হল ইসলাম।

অন্য আয়াতে আল্লাহ্‌ বলছেন,

“যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য জীবন ব্যবস্থা খোঁজ করবে, কোনদিনই তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত” [সূরাহ আলি ইমরান: আয়াত ৮৫]


অর্থাৎ ইসলাম ছাড়া আর কোন জীবন ব্যবস্থা মেনে চলা ব্যক্তির আখিরাতে ক্ষতি ব্যতীত কিছু পাওনা নেই। তার সেই জীবন ব্যবস্থা আল্লাহ্‌ কখনই, কোন অবস্থাতেই গ্রহণ করবেন না।

যারা ইসলামকে সত্যিকার অর্থেই গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন, তারা জানেন, ইসলাম মানব জীবনের কোন একটি স্তর, পর্যায় কিংবা ক্ষেত্র বাকি রাখে নি, যেখানে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত কোন গাইড লাইন প্রদান করা হয় নি। কিভাবে নখ কাটতে হয় থেকে শুরু করে কিভাবে শ’খানেক রাজ্যকে একজন শাসকের অধীনে নিয়ে এসে সমস্ত পৃথিবী শাসন করতে হয় পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ে ইসলাম দেখিয়েছে পথ। জ্বেলেছে আলোকবর্তিকা।

তাই বলা বাহুল্য, ইসলামের একটি অর্থনৈতিক দর্শনও রয়েছে। রয়েছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ইসলামের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার মধ্যে অন্যতম বিশদ, বিস্তর ও সুবিশাল শাখা হল ইসলামি অর্থনীতি। একজন মুসলিম হিসেবে, আমাদের অতি অবশ্যই ইসলামের অর্থনৈতিক মৌলিক তত্ত্ব, বাস্তবিক প্রয়োগ, সমাধান ও নির্ধারিত নিয়ম কানুন সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং অন্যান্য প্রচলিত অর্থনৈতিক পদ্ধতির সাথে ইসলামি অর্থনীতির পার্থক্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া ও হারাম হালাল সম্পর্কে সজাগ থাকা
জরুরী। আমরা যেমন মুসলিম হিসেবে খৃষ্টানদের রীতিতে আল্লাহ্‌র ইবাদত করতে পারি না কিংবা বৌদ্ধদের রীতিতে বিয়ে করতে পারি না, ঠিক সেভাবেই আমরা ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন নিয়মে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সমাধা করতে পারি না, যদি তা ইসলামের সাথে মৌলিক ভাবে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে।

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয় কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা। এই কুরআন সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসারে ইসলামি অর্থ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। সেই রাসূল [ﷺ] এর রাষ্ট্র থেকে শুরু করে খিলাফত রাষ্ট্র পর্যন্ত অর্থনীতি পরিচালিত হয় ইসলামি অর্থনীতির মাধ্যমে। খিলাফতের পতনের পর থেকে অবধারিত ভাবে ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রজ্বলিত আলোও স্তিমিত হয়ে আসে। ফলে দীর্ঘ শত বছর ধরে মুসলিম ভূমিগুলোতে অর্থ ব্যবস্থা দখল করে নিয়েছে প্রথমত সমাজতান্ত্রিক ও পরবর্তীতে পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থা। উভয়ের মৌলিক ধারনাই ইসলামের ঘোর বিরোধী। কিন্তু এই সুদীর্ঘ সময়ে মুসলিম জাতি এইসব মানবসৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রথা ও ব্যবস্থায় নিমজ্জিত হওয়ার দরুন ইসলামের মৌলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বেখবর হয়ে পড়েছে। ফলে ইসলামি অর্থনীতির প্রসঙ্গ তাদের কাছে নতুন কোন ফিলোসফি রূপে ধরা দেয়, অথচ এটা সেই ব্যবস্থা যা শত শত বছর ধরে কার্যকররূপে প্রচলিত ছিল এবং বর্তমান ক্যাপিটালিস্টিক ইন্টারেস্ট বেইসড সমাজের মত এর মেরুদন্ড কখনই ভেঙ্গে পড়ে নি।

অর্থনীতির মৌলিক উদ্দেশ্যের ব্যাপারে প্রখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ Richard Theodore Ely বলেন,


"Economics is a science, but something more than a science, a science that though with the infinite variety of human life, calling not only for systematic, ordered thinking , but human sympathy, imagination, and in an unusual degree for the saving grace of commonsense."

অর্থাৎ, অর্থনীতি কেবল একটি বিজ্ঞানই নয়, এটি কেবলমান্ত সুসংবদ্ধ, সুশৃঙ্খলিত চিন্তার আবেদনই জানায় না, মানুষের প্রতি সহানুভূতির উদ্রেক করতে ও বাস্তব জ্ঞান অসাধারণ পরিমান সম্প্রসারণ করতেও তা সচেষ্ট।

রাজনৈতিক অর্থনীতির জনক নামে খ্যাত স্কটিশ অর্থনীতিবিদ Adam Smith বলেছিলেন

 "Economics is the science of wealth."

অর্থাৎ অর্থনীতি হল সম্পদের (বন্টন) বিজ্ঞান।

অর্থনীতি বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল মেমোরিয়াল পুরস্কার প্রাপ্ত মার্কিন অর্থনীতিবিদ Paul A. Samuelson এর মতে,

"Economics is the study of how men and society choose, with or without the use of money, to employ scarce productive resources which could have alternative uses, to produce various commodities over time and distribute them for consumption now and in the future amongst various people and groups of society."

অর্থাৎ স্বল্প সম্পদ কি করে অর্থ ব্যবহার করে কিংবা না করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মাঝে বন্টন করা যায়, সে সংক্রান্ত বিদ্যাই হল অর্থনীতি।